একাত্তরের বিলেতি বন্ধু মার্ক টালি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে আমাদের পাশে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বহু বিদেশি সত্যিকার বন্ধুর মতো দাঁড়িয়ে গেছেন। আমাদের দুঃখ-বেদনার ভাগ নিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের মতো তারাও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। একাত্তরের এমন একজন বন্ধু বিলেতের মার্ক টালি।
মাতৃভাষা অবশ্যই মায়ের ভাষা, মাতৃস্তন্য অবশ্যই মায়ের দুধ, মাতৃস্নেহ অবশ্যই মায়ের স্নেহ। মাতৃভূমি কি মায়ের জন্মভূমি নয়? অবশ্যই। এই সত্যটি যদি আমরা স্বীকার করে নিই তা হলে মার্ক টালির মাতৃভূমি অবশ্যই বাংলাদেশ।
মার্ক টালির মা বাংলাদেশেই জন্ম গ্রহণ করেন। ১১৮৫৭-র সিপাই বিদ্রোহের আগেই ভারতবর্ষে আসেন মার্ক টালির নানার দাদা।
তিনি আফিম ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিলেন । উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে আফিম এজেন্ট ছিলেন। সিপাহি বিদ্রোহের ভয়াল যখন ইংরেজ মাত্রই সিপাহি এবং ভারতীয় বিপ্লবীদের টার্গেট এমন ভয়ঙ্কর সময়ে তিনি নৌকায় চড়ে নিরাপদ বিবেচনা করে কোলকাতা চলে আসেন । নানার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। আর মার্ক টালির নানার ছিল পাটের কারবার। সুতরাং সে কালের সোনালী আঁশ অঞ্চলই তাকে বেছে নিতে হয়েছে। ্েসজন্য পূর্ব বাংলাই ছিল উত্তম। এখানেই তার মায়ের জন্ম।
মার্ক টালির বাবার সাথে তার মায়ের প্রথম দেখা কোলকাতাতেই, তার বাবাও ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৩৫ সালে টালিগঞ্জে মার্ক টালির জন্ম । ছয় সন্তানের একজন হিসেবে তিনি বেড়ে উঠেন, কোলকাতায় হলেও তার শৈশব ছিল ' ভেরি ব্রিটিশ চাইল্ডহুড'। একেবারে ছোটবেলা থেকেই তিনি যে ইন্ডিয়ান নন বরং ব্রিটিশ এই শিক্ষাই পরিবার থেকে পেয়েছেন এবং এ কথা তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সপ্তাহের সাত দিন পুরো ২৪ ঘণ্টাই ব্রিটিশ ন্যানির নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে থাকতে হতো। ভারতীয় ড্রাইভারের কাছ থেকে শোনা শব্দ উচ্চারণ করার কারণে ন্যানি তার মাথায় চাটিও মেরেছে। যে সব ইংরেজ শিশুদের বাবা মার খাস ব্রিটিশ ন্যানির ভরণ পোষণের সামর্থ ছিল না, তাদের সন্তানের জন্য ভারতীয় কিংবা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ন্যানি রাখতে হতো।
কিন্তু মার্ক টালির এই বিলেতি ন্যানির শাসন এতোটাই কড়া ছিল যে তাকে এবং তার পরিবোরের শিশুদের এ ধরনের ন্যানি-লালিত শিশুদের সাথে মিশতে দিতেন না।
ভারতীয় জাত-পাত ও বৈষম্যের সাথে আর একটি ভিন্ন রূপ এর সাথে যোগ হয়েছিল কোলকাতায়। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) সদস্যদের মনে করা হতো ব্রাক্ষ্মণ, ভারতীয় সেনা সদস্যদের মনে করা হতো রাজপুত (যোদ্ধা শ্রেণী) আর আমার ব্যবসায়ী বাবা তাদের কাছে ছিলেন বৈশ্য। নাক উচু আইসিএস আর সামরিক বাহিনীর কাছে তিনি ছিলেন কেবল একজন বোচাওয়ালা ব্যাপারি।
'আমার বন্ধুরা প্রায় সবাই ভারতীয়। আমার কন্যার জামাতা এবং পুত্রবধু উভয়েই ভারতীয়। আমি ভারতীয় একটি ভাষা জানি। আমি আরো ভালো জানতে পারতাম যদি ভারতীয়রা আমার সাথে সাক্ষাতের সময় হিন্দিতে কথা বলতেন।' পাছে তিনি না বোঝেন এজন্য তারা ইংরেজি বলেন, এতে চর্চা হয়ে উঠে না। গোড়াতেই ইউরোপিয়ান ন্যানির কঠোর প্রহরা ছিল যেন তিনি হিন্দি শব্দ মুখে তুলে না নেন। একমাত্র ইংরেজিই ছিল তার কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা।
ভারতে আসা ব্রিটিশদের তখনকার বিধান ছিল ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ার বয়সে পৌঁছলে তাদের ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, লন্ডনে বোমা পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালযের শিক্ষা গ্রহণের জন্য মার্ক টালিকে দার্জিলিং পাঠানো হলো। 'সেগুলো ছিল আমার জন্য বিষ্ময়কর আনন্দের দিন। জায়গাটা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়, প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। সার্বক্ষণিক চোখে চোখে কেউ রাখত না। হেডমাস্টার ছিলেন খুব উদার। স্বাধীনভাবে বাজারে ঘুরে বেড়াতাম।'
এ সময় তার বাবার মানচেষ্টারে চাকরি হয়ে যাওয়াতে তাকে শৈশবের বাকী অংশটুকু কাটাতে হয় ব্রিটেনেই, বোডিং স্কুলে। ভারত তখন রয়ে যায় দৃষ্টিসীমার বাইরে। তাছাড়া ভারতের পাট তো চুকিয়েই চলে এসেছেন। সেই ভারত তার আর কখনো ফেরার কোনো কারণ ছিল না।
১০ বছর বয়সে ব্রিটেনে ফিরে যান, মার্লবরো কলেজ, ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনা করেন। তিনি আন্তরিকভাবেই সিদ্ধান্ত নিলেন ধর্মযাজক হবেন। সে উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালনয়ে ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। কিন্তু আর্কবিশপ সন্দিহান হলেন এই যুবক কৌমার্য ধারণ করে যাজক হতে পারবে না। তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। মার্ক টালি একটু আহত হলেও ভাবলেন তার কারণে চার্চের ভাবমূর্তি তো নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। পরবর্তী কালে তিনি স্বীকার করেছেন আর্কবিশপের সিদ্দান্তই সঠিক ছিল।
তিনি চার বছর একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে বিবিসিতে যোগ দিলেন- কিন্তু মোটেও সংবাদিক হিসেবে নয় প্রশাসন শাখাতে পার্সোনেল ম্যানেজার হিসেবে। তিনি সাংবাদিক হবেন, এ চিন্তা কখনো তার মনে আসেনি।
পরের বছর ১৯৬৫ সালে তিনি আকষ্মিকভাবে বিবিসি দিল্লি ব্যুরোতে কনিষ্ঠ প্রশাসনিক সহকারীর পদে বদলি হলেন। তিনি তার স্মৃতিময় জন্মস্থানে ফিরে এলেন যদিও জন্মস্থান সম্পর্কে এক বৈরি মন আগেই তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি।
মার্ক টালি মনে করলেন ভারতে ফিরে আসাটাই নিয়তি 'আমার ভারতে ফেরার কথা ছিল, তা ঘটে গেছে। পরের বছর সদরদফতর থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাকে বিবিসির নিউজ করেসপন্ডেন্ট করা হলো। দিল্লিতে থাকার তার অফিস কিন্তু তাকে কাভার করতে হবে গোটা দক্ষিণ এশিয়া- ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা নেপাল। তখন বাংলাদেশ তো পাকিস্তানেরই অংশ।
সাংবাদিকতাই হয়ে উঠে তার নিয়তি
১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার সময় মার্ক টালিসহ ৪০ জন বিদেশি সংবাদদাতাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়। উনিশ মাসের জরুরী অবস্থার ১৮ মাসই তিনি ছিলেন ভারতের বাইরে। জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা হলে তিনি দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো চিফ হিসেবে যোগ দেন।
বিবিসি প্রধান জন বার্টের সাথে বিরোধের জের ধরে তিনি ১৯৯৪ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন জন বার্ট বিবিসি চালান ভয় দেখিয়ে কিংবা চাটুকার বৃত্তির মাধ্যমে। ২০০২ সালে ব্রিটেন তাকে নাইটহুড প্রদান করে- স্যার মার্ক টালি।
রেডিও ছাড়ার পর তিনি দীর্ঘদিন বিবিসি টেলিভিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরের বাংলাদেশকে কাভার করা তার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা- 'এতে আমার নাম ও খ্যাতি বেড়ে যায়। তিনি ভারতে পরিচিত হয়ে উঠেন 'ভয়েস অব ট্রুথ' বা 'সত্যের স্বর' হিসেবে। মার্ক টালির যে সময় টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তখন জন্ম সনদ দেবার ব্যবস্থা ছিল না। তখন টালিগঞ্জ ছিল কোলকাতা কর্পোরেশনের বাইরে। ৭৮ বছর বয়সে তিনি জন্মসনদ নিলেন এবং এটি ব্যবহার করে ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া গ্রহণ করলেন।
মার্ক টালি এখন ৮৫ পেরোলেন। তিনি এখন লেখক হিসেবেই বেশি পরিচিত। ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে ভারতের সব প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়েছে। বিস্তৃত তার স্মৃতির ভান্ডার। লেখার ধরনের কারণে তাকে হিন্দি ভাষার লেখকরা বলে থাকেন ইংরেজ প্রেমচাঁদ। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবেদন করার সময় হিন্দু মৌলবাদিরা তাকে হত্যা করার জন্য অভিযান চালিয়েছে।
বিবিসি সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। সরকারের মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যমের উপর অনেকেরই বিশ্বাস নেই। মার্ক টালি সঠিক সংবাদের জন্য এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে বেড়াতেন। সঠিক সংবাদ বের করা তার আনন্দময় অভিযানের অংশ হয়ে উঠে।
একাত্তরে কী ঘটেছে বাংলাদেশে⎯তার শ্রেষ্ঠ চিত্রটি দিতে পারবে বিবিসি লন্ডন। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সকাল-সন্ধ্যায় বিবিসি শোনা মানেই ছিল বিজয়কে আর একটু এগিয়ে নেওয়া। বিবিসির অগ্রনায়কদের একজন মার্ক টালি।
একাত্তরে কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিনই কখনো সবগুলো অধিকেশনেই মার্ক টালিকে পাওয়া যাচ্ছে: পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে ভাষ্য মার্ক টালি, ব্রিটিশ পত্র পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিকেদন পাঠাচ্ছেন মার্ক টালি, বাংলাদেশ বিষয়ে রিপোর্ট সম্পাদনা করছেন মার্ক টালি।
একাত্তরের স্মৃতি যাদের কাছে এখনও জাগ্রত⎯নব ঘুরিয়ে বিবিসি রেডিও ধরা এবং মার্ক টালির নাম শোনার পর আরও সচেতন হওয়া⎯যেন একটি শব্দও তার অশ্রুত না থাকে, এ ছিল তাদের নিত্যকার দু'বেলার রুটিন। একাত্তরে সংবাদমাধ্যমের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে মার্ক টালিরই নাম।
মার্চ ১৯৭১-এর হত্যাযজ্ঞের পর পাকিস্তানের দু'অংশের যে আর একই দেশ হিসেবে সহাবস্থানের সুযোগ নেই তিনি একাধিকবার তা বলেছেন। তার প্রতিবেদন ও আলোচনার ভাষা মনে করিয়ে দিতে পারে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সহযোদ্ধাদেরই অন্যতম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধসহ ভারতের প্রধান ঘটনা ও দুর্ঘটনার শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদনগুলো তার হাতেই প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে রাণ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিক বরেছে। ভারত সরকার তাকে 'পদ্মশ্রী' ও 'পদ্মভূষণ' খেতাবে ভূষিত করেছে, ব্রিটেন দিয়েছে 'অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার' এবং নাইটহুড। সংবাদকে মানবিকীকরণ মার্ক টালির অন্যতম প্রধান অবদান।
তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে⎯No Full Stops in India, Non-Stop India, India in Slow Motion, The Heart of India, Devide and Quit, Last Children of the Raj, From Ray to Rajib; Four Faces : A Journey in Search of Jesus the Divine, the Jew, the Rebel, the Sage, Beyond Purdah, India's Unending Journey: Finding balance in a time of change, Upcountry Tales, Ram Chander's Story, The Lives of Jesus (BBC Books)
তিনি সতীশ জ্যাকবকে নিয়ে লিখেছেন Amritsar: Mrs. Gandhi's Last Battle। তাঁর ফিকশন Hindutva, Sex and Adventure তাঁকে খানিকটা বিতর্কিত করেছে।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তিনি নয়া দিল্লির একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
