সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন: হট্টগোলের মধ্যেই সব পদে আওয়ামী লীগপন্থীদের জয়
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির একতরফা নির্বাচনে (২০২৩-২৪) আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের প্যানেল (সাদা প্যানেল) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১৪টি পদের সবকটিতে জয়ী হয়েছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) দ্বিতীয় দিনের ভোটগ্রহণ শেষে মধ্য রাতে সমিতির দক্ষিণ হলে নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত উপকমিটির আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান এই ফলাফল ঘোষণা করেন।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের প্রার্থী মোমতাজ উদ্দিন ফকির তিন হাজার ৭২৫ ভোট পেয়ে সভাপতি হিসেবে পুননির্বাচিত হয়েছেন। এই প্যানেলের প্রার্থী মো. আবদুন নূর দুলাল তিন হাজার ৭৪১ ভোট পেয়ে সম্পাদক পদে পুননির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া সহসভাপতির দুটি পদে সাদা প্যানেল থেকে মো. আলী আজম ও জেসমিন সুলতানা জয়ী হয়েছেন। কোষাধ্যক্ষ পদে একই প্যানেলের এম. মাসুদ আলম চৌধুরী জয়ী হয়েছেন। সহসম্পাদক হিসেবে জয় পেয়েছেন এ বি এম নূর-এ-আলম ও মোহাম্মদ হারুন-উর রশিদ। আর সদস্য সাতটি পদে সাদা প্যানেল থেকেই জয়ী হয়েছেন, মহিউদ্দিন আহমেদ (রুদ্র), মনিরুজ্জামান রানা, শফিক রায়হান শাওন, মো. সাফায়েত হোসেন (সজীব), মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. নাজমুল হুদা ও সুভাষ চন্দ্র দাস।
নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলা আর দুই পক্ষের আইনজীবীদের হট্টগোল-ধাক্কাধাক্কি ও মামলায় গতকাল শেষ হয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুইদিন ব্যাপী নির্বাচন।
নির্বাচনে দুই দিনে মোট ভোট পড়ে ৪১৩৭টি। নির্বাচনে ব্যালট পেপার চুরি ও ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে মামলার আসামি হয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সম্পাদক প্রার্থী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ বহু আইনজীবী।
গত বুধবার (১৫ মার্চ) প্রথম দিনের ভোট চলাকালে সাদা (সরকার সমর্থক) ও নীল (বিএনপি সমর্থক) দলের দিনভর দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, হাতাহাতি, হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনা ঘটে। এতে আইনজীবী, সাংবাদিকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন।
বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) ভোটগ্রহণের দ্বিতীয় দিনেও বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রের সামনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
তবে বিএনপিপন্থীরা ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির সাথে খাস কামরায় দেখা করেন এবং আগের দিনের ঘটনা তুলে ধরেন।
বিকেল ৪টায় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের 'ভোট চোর' আখ্যায়িত করে স্লোগান শুরু করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এরপর আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরাও একই স্থানে স্লোগান শুরু করেন। পাল্টাপাল্টি স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ।
এর মধ্যেই বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
সেখানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, প্রধান বিচারপতি বলেছেন, 'এটা আইনজীবী সমিতির বিষয়। এখানে প্রধান বিচারপতির করণীয় কিছু নেই। আপনারা বারের সিনিয়র আইনজীবীদের নিয়ে বসে আলাপ করে সমস্যার সমাধান করুন। সবাই মিলে পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার চেষ্টা করুন।"
এদিকে নির্বাচনে ব্যালট পেপার চুরি ও ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে সমিতির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান শাহবাগ থানায় মামলা করেন। মামলায় বিএনপিপন্থী আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কুদ্দুস সহ ১২ জন আইনজীবীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১০০ জনকে আসামি করা হয়।
সেই একই দিনে আইনজীবী সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা রবিউল হাসান বাদী হয়ে বিএনপির শতাধিক আইনজীবীর নামে মামলা করেন।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ১৩ মার্চ সাদা ও নীল উভয় প্যানেলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু মনসুরুল হক 'ব্যক্তিগত' কারণ দেখিয়ে পরদিন পদত্যাগ করেন।
সমিতির একাধিক নেতা টিবিএসকে জানান, মনসুরুল হক ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রস্তাব দিলেও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা তা নাকচ করে দেন। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির ও আব্দুন নূর দুলালের ওপর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার জন্য আহ্বায়ককে চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে ১৪ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা মো. মনিরুজ্জামানকে নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত করায় দুই প্যানেলের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে একই পদে মোকতার কবির খানকে মনোনয়ন দেন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা।
এ বিভাজন থেকেই মিছিল, হট্টগোল ও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। শেষে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
