মন্দাকাল নতুন ব্যবসার দারুণ সময়!
জেনারেল মোটরস (জিএম), বার্গার কিং, সিএনএন, উবার ও এয়ারবিএনবির মধ্যে মিল কোথায়? অর্থনৈতিক মন্দাকালেই যাত্রা শুরু এ কোম্পানিগুলোর।
জিএম যাত্রা শুরু করে ১৯০৮ সালে; অর্থনৈতিক সংকট 'দ্য প্যানিক অব ১৯০৭'-এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যখন বিপর্যয়ে, সে সময়ে।
অন্যদিকে, বার্গার কিং প্রথম খাদ্যপণ্য বাজারে আনে ১৯৫৩ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র পড়ে গিয়েছিল আরেকটি মন্দায়। সিএনএন সংবাদ সম্প্রচার শুরু করে ১৯৮০ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশ।
আবার, ২০০৭-০৯ সময়কালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের ভেতরই যাত্রা শুরু করে উবার ও এয়ারবিএনবি।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের ফেলো ডেন স্ট্র্যাংলার এইসব উদারণ সামনে রেখে দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নতুন ব্যবসার দ্বার খুলে দেওয়ার দারুণ সম্ভাবনা রাখে। খবর বিবিসির।
স্ট্র্যাংলার বলেন, 'যদি মন্দাকালে ব্যবসা শুরু করেন, তাহলে কোম্পানিকে সফল করে তুলতে আপনাকে সত্যিকার অর্থেই শক্ত হাতে হাল ধরতে এবং কৃপণের মতো হিসেব কষতে হবে। কেননা, এমনই সময়ে আপনি ব্যবসায় হাত দিয়েছেন, যখন অর্থের প্রবাহ নেই এবং এ কারণে ক্রেতারও চাহিদা নেই।'
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বিশ্ব আবারও অর্থনৈতিক মন্দার কালো থাবা দেখতে পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির ৫ দশমিক ২ শতাংশ সঙ্কোচন ঘটবে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ও ১৯৪৬ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই মন্দার দেখা পেয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের অনুমান, ১৭০৬ সালের, অর্থাৎ ৩১৪ বছর পর সবচেয়ে মন্দা অবস্থার দেখা পেতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
তবে ইতিহাস সাক্ষী, কঠিন পরিস্থিতির ভেতরও সফল কোম্পানির জন্ম হতে পারে। তাই করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত পৃথিবীতেও নতুন কোনো কোম্পানির আবির্ভাব ও পরবর্তীকালে সেগুলোর সাফল্য গাথা লেখা হলেও হতে পারে!
তবে নতুন নতুন ব্যবসার আবির্ভাব যে ঘটবে, এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসেবমতে, দেশটিতে মে মাসের শেষ সপ্তাহে নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার আবেদন জমা পড়েছে ৬৭ হাজার ১৬০টি!
গত বছরের একই সপ্তাহের তুলনায় এ সংখ্যা ২১ শতাংশ বেশি। অথচ, ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় গত বছর সেটি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান্টা ক্রুজের অর্থনীতির অধ্যাপক রবার্ট ফেয়ারলি বলেছেন, চাকরি যখন দুর্লভ হয়ে ওঠে, মানুষ তখন আরও বেশি ব্যবসা শুরু করে। এই প্রবণতাকে তিনি 'শিল্পোদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা' বলে অভিহীত করেছেন।
তার ভাষ্য, বেতনভুক্ত চাকরি করার সুযোগ যখন কারও থাকে না, তখন নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রেরণা পায় তারা।
অধ্যাপক ফেয়ারলি বলেন, 'শাটডাউনের সময়ে কর্মব্যস্ততা থেকে রেহাই পেয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় বেশি পায় মানুষ। ফলে ব্যবসার আইডিয়া মাথায় এলে সেটি নিয়ে একটু চেষ্টা করার ভাবনা আসে তাদের।'
অন্যদিকে, করোনাভাইরাসের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কিছু ব্যবসারও আবির্ভাব ঘটেছে। যেমন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) ভীষণ চাহিদা ও ঘাটতি দেখা দেওয়ায় গত কয়েক মাসে এটি তৈরির বেশ কিছু ফার্ম গড়ে উঠেছে।
এপ্রিলে ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের ইনস্টিটিউট অব ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের সিনিয়র ফেলো ম্যাথু ক্যাম্পবেল-হিল ও তার স্ত্রী লিডিয়া তাদের কোম্পানি 'অ্যারোসোল শিল্ড'-এর যাত্রা শুরু করেছেন। ছোট ও পপ-আপ মেডিকেল আইসোলেশন শিল্ড বা 'তাঁবু' তৈরি করে এই ফার্ম। একটি প্লাস্টিক ফ্রেমে ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিক শিট জুড়ে দিয়ে তৈরি সেই শিল্ড। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর মাথা ও কাঁধে এটি সেঁটে দেওয়া যায়। ফলে তার কাছ থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের শরীরে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।
ক্যাম্পবেল-হিল বলেন, 'ব্যবসার ভাবনা থেকে শুরু করিনি, বরং কোম্পানিটি চালু করার ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত সন্দিহান ছিলাম। সপ্তম দিনে কাজ শেষ করার আগেই প্রচুর অর্ডার পেতে থাকি।'
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি কোম্পানি চলতে শুরু করেছে। অক্সফোর্ডশায়ারের ব্যবসায়ী নিল কটন জুন মাসেরই শুরুতে চালু করেছেন ফেসমাস্ক সাপ্লাইয়ের কোম্পানি 'হিডেন স্মাইল'।
ভেতরে একটি ফোল্ডেড পেপার ফিল্টার সহকারে, সুতি কাপড়ের দুই স্তরি মাস্ক নিয়ে ব্যবসা এটির।
কটন বলেন, "আপনাকে ফিল্টারটি বারবার বদলাতে হবে না; কেননা, বাইরের আবহাওয়া কিংবা নিঃশ্বাসের তাপেও আর্দ্র হবে না এটি। পরলে আপনাকে দেখাবে মেডিকেল ট্রিভি ড্রামা 'হলবি সিটি'র কোনো এক্সট্রার মতো!"
করোনাভাইরাসে প্রভাবে আরও যেসব ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবসা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং এর ফলে নতুন ব্যবসা শুরুর সুযোগ দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে আবাসন উন্নয়ন ও ডেলিভারি খাত।
২০১৮ সালে ইউএস পেইন্ট ফার্ম 'ক্লেয়ার' প্রতিষ্ঠাকারী নিকোল গিবন্স জানান, লকডাউনের কারণে তার পণ্যের বিক্রি বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, 'ছুটির দিনগুলোতে মানুষ সাধারণত একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। বাড়িঘর রঙ করার পেছনে খাটতে চায় না। এখন ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে তারা এ রকম কিছু একটা করে সময় কাটাতে চাচ্ছে।'
অন্যদিকে, লন্ডনভিত্তিক কুরিয়ার সার্ভিস 'গোফর' জানিয়েছেন, অনলাইন শপিং বেড়ে যাওয়ায় দু'মাস ধরে তাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে।
ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্সি 'ম্যাককিন্সে'র পার্টনার মার্কুস বার্জার দু লিয়নের পরামর্শ, এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি ব্যবসা শুরু করতে চান, তাহলে হুজুগে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখুন। অবশ্য, ঝাঁপানোর সিদ্ধান্ত যদি নিয়েই ফেলেন, তাহলে আর দেরি করবেন না।
তিনি বলেন, 'নিজের টাকা এ-কাজে নাকি অন্যকিছুতে খরচ করবেন- সেটি আপনাকেই ভাবতে হবে। নিজের কোম্পানি দাঁড় করানোর জন্য আপনার ভেতর দক্ষতা থাকা চাই। আর অল্প পুঁজি নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব, শুরু করে দেওয়া ভালো। মন্দাকালে টিকে যাওয়া নতুন ব্যবসার পক্ষেই ব্যবসার শিক্ষা সবচেয়ে দ্রুত নেওয়া সম্ভব।'
