আফগান সংকট: তালেবান-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন যুগ শুরু
কাবুল তালেবানের দখলে যাওয়ার পর গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় সরকারগুলো যখন তাদের সৈন্য ও নাগরিকদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে, তখন রাশিয়াকে অনেকটাই শান্ত থাকতে দেখা যায়।
রাশিয়ার কূটনীতিকরা তালেবানদের 'স্বাভাবিক মানুষ' হিসেবে দাবি করে বলেন, রাজধানী কাবুল এখন আগের চেয়ে যথেষ্ট নিরাপদ। এছাড়া, শুক্রবার (২০ আগস্ট) প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, তালেবানের ক্ষমতা দখল একটি বাস্তবতা, যা মেনে নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়েছিল।
আফগানিস্তানে ১৯৮০'র দশকে নয় বছরব্যাপী সোভিয়েত অভিযানের প্রতিই এখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অধিকাংশ দেশই আফগানিস্তানে দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু রাশিয়া কাবুলে দূতাবাস কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে। তালেবানরা কাবুল দখলের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি ঝিরনভ একজন তালেবান প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন তিনি সেখানে কোনো ধরনের প্রতিহিংসা কিংবা সহিংসতা দেখতে পাননি।
মস্কোর জাতিসংঘ প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া আফগানিস্তানের জাতীয় পুনর্মিলনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলেছেন। সেই সঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, দেশে আইন -শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে এবং "বহু বছরের রক্তপাতের অবসান" ঘটেছে।
এছাড়া, আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিশেষ দূত জামির কাবুলভ বলেন, নির্বাসিত রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানির পু্রোনো 'পুতুল সরকারের' তুলনায় তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করা বেশ সহজ।
যদিও রাশিয়া তালেবান গোষ্ঠীকে এখনও আফগানিস্তানের নতুন সরকার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবে তালেবানের প্রতি যথেষ্ট নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে।
রাশিয়ার বার্তাসংস্থা তাস থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোয় তালেবানকে এখন আর "সন্ত্রাস" নয়, বরং "মৌলবাদী" বলা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে তালেবানের সঙ্গে রাশিয়া যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। ২০০৩ সাল থেকে তালেবান রাশিয়ার সন্ত্রাসী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকায় থাকলেও, ২০১৮ সাল থেকে তালেবান প্রতিনিধিরা মস্কোতে আলোচনার জন্য যাওয়া-আসা শুরু করেন।
পশ্চিমা সমর্থিত সাবেক আফগান সরকার রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে প্রকাশ্যে তালেবানদের সমর্থন দেওয়াসহ তিন বছরের মস্কো আলোচনায় আফগান সরকারকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেছিল।
এমন অভিযোগকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিশেষ দূত জনাব কাবুলভ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন। তবে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি বলেছিলেন, ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গি দমনে তালেবানের সঙ্গে রাশিয়ার স্বার্থের জায়গা মিলে যায়।
কাবুলভের এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে যায়নি। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রাশিয়ার ওপর তালেবান বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনে। তবে, সেই অভিযোগও মস্কো অস্বীকার করে।
তালেবানের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও মস্কো এখনই সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাদের নাম সরিয়ে দিচ্ছে না। এর জন্য সময় নিয়ে আফগানিস্তানে তালেবানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবে দেশটি।
তালেবান গোষ্ঠী তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ঠিকঠাকভাবেই বাস্তবায়ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।
তিনি বলেন, "প্রতিবেশী দেশগুলোয় যেন সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করতে না পারে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।"
তালেবানের প্রতি রাশিয়ার এমন নমনীয় নীতি গঠনের মূল কারণ হলো, মস্কো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়। এছাড়া আফগানিস্তানের রাশিয়ার যুদ্ধ পরাজয়ের এক বেদনাদায়ক ইতিহাসও রয়েছে। তাই, মস্কো তার মধ্য এশিয়ার মিত্রদের জন্য একটি নিরাপদ সীমান্ত অঞ্চল এবং সন্ত্রাসবাদ বিস্তার ও মাদক পাচার রোধ করতে চায়।
৯/১১ ঘটনার পর পশ্চিমা ন্যাটো বাহিনীর আফগান অভিযানকে প্রথম দিকে রাশিয়া সমর্থন করলেও ধীরে ধীরে ওয়াশিংটন এবং মস্কোর সম্পর্ক শীতল হতে থাকে।
এটা খুবই স্পষ্ট যে, রাশিয়া আফগানিস্তানে তার সামরিক শক্তি দেখাতে চায় না। ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে মস্কোর অভিযানে ১৫ হাজার সোভিয়েত কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছিল। টানা নয় বছরের যুদ্ধের পর ১৯৮৯ সালের পরজয় ছিল রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। দেশের অর্থনীতিতেও পড়েছি বড় ধরনের প্রভাব।
আর সে সময় সোভিয়েত সমর্থিত বাবরাক কার্মাল সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান, ইরান ও সৌদি আরব তৎকালীন মুজাহিদিনদের অস্ত্র ও অর্থের যোগান দেয়। মুজাহিদিনরা সাফল্যের সঙ্গেই সোভিয়েত সেনা ও তৎকালীন সরকারকে পরাজিত করতে পেরেছিল। ১৯৮৯ সালে এক অপমানজনক যুদ্ধ সমাপ্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।
অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, তালেবানদের ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারটি রাশিয়া স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার ভাব দেখালেও, অন্যসব দেশের মতো মস্কোও বিস্মিত হয়েছে।
রাশিয়ান সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি আফগানিস্তান স্টাডি'র গবেষক আন্দ্রে সেরেনকো বলেন, "আমরা মস্কোর কৌশল সম্পর্কে কিছুই বলতে পারি না। তবে, আঞ্চলিক কাঠামোর পুনর্গঠনে দেরি হওয়ায় মস্কো বেশ উদ্বিগ্ন।"
তালেবান শাসনের ব্যাপারে মস্কো সতর্ক রয়েছে।
রাশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রধান আন্দ্রেই কর্টুনভ মনে করেন, তালেবানরা পুরো দেশ, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ সমস্যায় পড়তে পারে এবং এটি রাশিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, "সম্ভবত, আল-কায়েদার একাংশ এবং আইসিসের আফগানিস্তান শাখা মধ্য এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিতে পারে।"
তিনি আফগান অর্থনীতির তীব্র অবনতির আশঙ্কাও করেছেন, যা অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
- সূত্র: বিবিসি
