পেপার কোন ও টিউব উৎপাদনে বিপুল সম্ভাবনা
- এক দশকে কারখানা বেড়েছে ৫ গুণ
- বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা
- প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান
- ১০ বিলিয়ন রপ্তানি সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তরা
- আগামী বছর থেকে ভ্যাটে সরকারের ১০ শতাংশ ছাড়
জোবায়ের হোসেন রানা, ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেন। তারপর হতাশা ও পরিবারের দরিদ্রতা থেকে বাঁচার জন্য গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ থেকে মামার বাড়ি নরসিংদী চলে আসেন, কাজ নেন সুতার গুদামে।
মামার সুতার কারখানায় কাজের সূত্রেই টেক্সটাইল মিলের জন্য পেপার কোনের ব্যবসার ধারণা আসে জোবায়েরের। নিজের জমানো ৫০ হাজার টাকায় ২০১০ সালে ভাড়া বাসায় গড়ে তোলেন ছোট ইন্ডাস্ট্রি। দশ বছরের ব্যবধানে মেশিনারিজ ও অন্যান্য সম্পদ মিলে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি টাকার মালিক জোবায়ের। নিজের দরিদ্রতা ঘুচিয়ে নরসিংদীর এতিমখানায় ৪০-৫০ জন শিশুর দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি।
জোবায়ের হোসেন রানা টিবিএসকে বলেন, মাত্র ১০ জন কর্মচারী নিয়ে আমি আমার ফ্যাক্টরি শুরু করি, প্রথমদিকে দৈনিক ১০-১২ হাজার পিস পেপার কোন উৎপাদন হতো। এখন আমার কারখানায় দৈনিক ১ লাখ পিসের বেশি উৎপাদন হয়। ৫০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।
পেপার কোন এন্ড টিউব মূলত একটি মোড়কজাত পণ্য, যা স্পিনিং মিল, টেক্সটাইল মিল, জুট মিল ও পলিপ্যাক ইন্ডাস্ট্রিতে বহুল ব্যবহার হয়। এই পণ্যটি দেশের টেক্সটাইল মিলগুলোতে মোড়ক হিসেবে ব্যবহার হয়।
সাধারণত রাস্তাঘাটে ব্যাপক পরিমাণে বর্জ্য কাগজ ফেলা হয়। গ্রাম-শহরের এই বর্জ্য কাগজকে কুড়িয়ে রিসাইক্লিং (পুনরায় উৎপাদন) করে সিম্প্লেক্স বোর্ডে রূপান্তর করা হয়, আর তা থেকে তৈরি করা হয় এই মূল্যবান পেপার কোন ও পেপার টিউব পণ্য।
একসময় শতভাগ আমদানি নির্ভর পেপার কোন ২০১০ সালের আগেও ৮০-৯০ শতাংশ ভারত,পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসতো। বর্তমানে দেশীয় কাঁচামাল ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় শতভাগই দেশে উৎপাদন হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেপার কোন এন্ড টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের (বিপিসিটিএমএ) তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ৫০০টি পেপার কোন এন্ড টিউবের কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে এসোসিয়েশনের নিবন্ধিত কারখানা হচ্ছে ১৮০টি। দেশের ৬০০টি স্পিনিং মিলে এই পণ্যটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর সরকার এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় করে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ খাতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৩ লাখের অধিক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক এবং কারখানাগুলোও প্রায় শতভাগ পরিবেশবান্ধব।
জোবায়ের হোসেনের মতোই আরেক সফল ব্যবসায়ী গাজীপুরের শাওন মাহমুদ। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পেপার কোন এন্ড টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও।
শাওন মাহমুদ ১৯৯৯ সালে মাত্র ৫২ হাজার টাকা পুঁজিতে এ পেপার কোন ও টিউব ব্যবসা শুরু করেন। ভাড়া বাসায় মাত্র ৭ জন কর্মচারী নিয়ে তিনি তখন দৈনিক ১২ হাজার পিস পেপার কোন উৎপাদন করতেন। এখন তার কর্মচারীর সংখ্যা ৪০জন ও দৈনিক উৎপাদন ৫০ হাজার পিস।
শাওন মাহমুদের টিবিএসকে বলেন,'বহু পরিশ্রমের বিনিময়ে কারখানাটি গড়ে তুলেছি, কিন্তু বিদেশি পণ্যের সয়লাবের কারণে আমরা বাজারে তেমন টিকতে পারিনি। তবে যখনই সরকার আমদানি করা পেপার কোন ও টিউবে শুল্ক আরোপ করে তখনই দেশীয় এই শিল্পের ভাগ্যের চাকা ঘু্রে যায়'।
জানা যায়, ১৯৫৫ সালে প্রথম এদেশে ঝুলন্ত পদ্ধতি ব্যবহার করে সুতা পেঁচানো হতো, পরবর্তীতে পাশাপাশি কনিকেল কোনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে মিলগুলো আধুনিকায়নের ফলে পেপার কোন এন্ড টিউবের ব্যবহার হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
১৯৮৮ সালে প্রথম বেসরকারি পর্যায়ে দেশে পেপার কোন ও টিউব কারখানা গড়ে উঠে; তখন সায়াম, মুক্তাদির ও মুন্ন টেক্সটাইল- এই কয়েকটি কারখানা প্রথম উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে এই কারখানাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পেপার কোন এন্ড টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের ( বিপিসিটিএমএ ) সিনিয়র সহ-সভাপতি আকবর আলী বলেন, বিদেশি পেপার কোন ও টিউব আমদানিতে শুল্ক না থাকায় ২০১০ সালের আগে স্থানীয় উদ্যোক্তারা লোকসান করতেন। ফলে সেভাবে বিনিয়োগ আসেনি।
২০১০ সালে সরকার বিদেশি পেপার কোন ও টিউব আমদানিতে ১৫% শুল্ক আরোপ করলে দেশের কারখানাগুলোতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যায়, তখন থেকেই দেশের পেপার কোন শিল্পে ব্যাপক প্রসার ঘটে, বিদেশ থেকে এই পণ্য আমদানি প্রায় শতভাগ বন্ধ হয়ে যায়। ১০ বছরের ব্যবধানে কারখানার সংখ্যা ১০০ থেকে ৫ শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
২০২১-২২ এর বাজেটে দেশীয় উৎপাদিত পেপার কোন ও পেপার টিউব পণ্যের উপর ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ৫% করায় এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন আকবর আলী।
দারুণ সম্ভাবনা রপ্তানিতে
স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিতেও বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন সংগঠনটির সভাপতি সরকার মো. সালাউদ্দিন।
তিনি বলেন, 'আমাদের কারখানাগুলো ১০০% পরিবেশ বান্ধব। ড্রীম এক্সপোর্ট হিসেবে পণ্যটি ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেচা-কেনা হয়। দেশের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানিতে আমরা বড় বাজার ধরতে পারব। অন্যান্য খাতের মতো সুবিধা দিলে আগামী দশ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করা যাবে'।
তবে এ জন্য তাদের প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে পণ্যে ভ্যাট, করছাড় দিতে হবে বলে দাবি করেন সালাউদ্দিন।
তিনি আরো বলেন, এই পণ্যটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানির অন্তর্ভুক্ত হলে এ খাতটি ব্যাপক লাভবান হবে, বিদেশ থেকে কাচাঁমাল-কাগজ আমদানি করতে পারব, এলসি'র মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি করতে পারব'।
