পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ
গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) পদোন্নতি নীতিমালা মানা হচ্ছে না। পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। ফলে অনেক যোগ্য কর্মকর্তার পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। পদোন্নতি নিয়ে এ ধরনের অনিয়ম ঢাকতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত ছয় বছর ধরে জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করছে না।
ব্যাংকটিতে বর্তমানে কর্মরত জনবল সংখ্যা ৪ হাজার ৯৬ জন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১৮ সালে সর্বশেষ রাকাবের ৫ হাজার ৮৭৯ জন জনবলের অনুমোদন দেয়। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির যেসব নিয়োগ ও বদলি হয়েছে তাতে বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতাও দেখা গেছে।
চলতি বছরে পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই শাখা ব্যবস্থাপকের অভিজ্ঞতা না থাকা সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার জুলিয়া খাতুন ও ফারজানা জামানকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিবেচনাধীন রেখেছে বলে অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে।
এই দুই কর্মকর্তার মাঠ পর্যায়ে কাজ করারও কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অথচ রাকাবের পদোন্নতি নীতিমালার ২.৭ এর 'ক' ধারায় বলা আছে, মূখ্য কর্মকর্তা (প্রিন্সিপাল অফিসার) থেকে উর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এবং সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে সহকারি মহাব্যবস্থাক (এজিএম) পদে পদোন্নতি পেতে হলে শাখা ব্যবস্থাপক হিসাবে নুন্যতম ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
আবার সরকারি মহাব্যবস্থাক থেকে উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে পদোন্নতি পেতে হলে দুই বছরের শাখা ব্যবস্থাপকের অভিজ্ঞতাসহ মাঠ পর্যায়ে ৭ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অতীতে ব্যাংকটি এই নীতিমালা লংঘন করে পছন্দের কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে। বর্তমানেও আইটি বিভাগসহ ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের অনেক কর্মকর্তার শাখা পর্যায়ে কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের পদোন্নতি দিয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নজরদারির অভাবে ব্যাংকটিতে এমন অনিয়ম সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যাংকটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
রাজশাহীতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ও ১৯টি আঞ্চলিক অফিস সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা ব্যাংকটিতে চাকরি নিয়েছেন। এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন (প্রিন্সিপাল অফিসার, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও এজিএম) যারা কর্মজীবনে কখনো কোনো শাখায় কাজ করেনি, অথচ ব্যাংকটির পদোন্নতি নীতিমালায় এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা স্পষ্ট বলা রয়েছে।
এছাড়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদিত পদোন্নতি নীতিমালা ২০১৬ (রাকাবোর কর্মকর্তা-কর্মচারী) অনুযায়ী প্রতি বছর ৩০ জুন ও ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন গ্রেডে পদোন্নিতিযোগ্য শুন্য পদের তিলিকা প্রস্তুত করে পদোন্নতির প্রস্তাব, তথ্য ও আনুসঙ্গিক কর্মপরিকল্পনা প্রণোয়ন করার কথা রয়েছে, কিন্তু ব্যাংক তা না করে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিচ্ছে।
রাকাবের সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পরেও রাকাব কর্তৃপক্ষ জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ না করে পদোন্নতি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। তালিকা প্রকাশ না করায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কোন কোন কর্মকর্তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা তা সকলের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আইন ২০১৪ বলে প্রণীত রাকাবারের প্রবিধানমালার ১৩(৫) ধারায় বলা আছে, "ব্যাংক ইহার কর্মচারিদের গ্রেড ওয়ারি জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণ করিবে এবং সময় সময় তাহাদের অবগতির জন্য ইহা প্রকাশ করিবে।"
এ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গা ছাড়া ভাব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির অভাব সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সর্বশেষ প্রকাশিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, উর্ধ্বতন কর্মকতাদের মেধাক্রমে থাকা প্রথম ২৪ থেকে ৮৪ নং কর্মকর্তাদের ডিঙ্গিয়ে ২৪৫ নং হতে ৩৯২ নং কর্মকর্তা পর্যন্ত ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে পদোন্নতি দিয়ে অনিয়ম শুরু করেন তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তীতে কাজী আলমগীর (বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত) রাকাবে ব্যবস্থপনা পরিচালক থাকাকালেও কোনো ব্যবস্থা নেননি।
এদিকে জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে পদোন্নতি দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যার্ন্ডার্ডকে জানিয়েছেন ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা। এর মধ্যে আবারও জ্যেষ্ঠতা লংঘনের ধারাবাহিকতায় পদোন্নতি দেওয়া হলে পদোন্নতি বঞ্চিতদের অসোন্তষ চরমে পৌছাবে।
নিয়ম লংঘন করে প্রধান কার্যালয়সহ এক শাখায় তিন বছরের বেশিও সময় ধরে কাজ করছেন অনেক কর্মকর্তা। একই স্থান, শাখা ও অঞ্চলে তিন বছরের বেশি সময় কর্মরত থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাকাবের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী মুকুল বর্ধন, কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত হাকিম দেওয়ান, ঢাকা শাখায় কর্মরত শফিকুল ইসলাম একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় কর্মরত রয়েছেন।
এক শাখায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাংক কর্মকর্তার এক শাখায় তিন বছরের বেশি না থাকার নির্দেশনা দিয়েছে।
এছাড়াও রাজশাহীতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ভুল তথ্য দিয়ে কর্মীর মাসিক প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে ঢাকা করপোরেট শাখার অনেকে। শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান নিজ জেলা নওগা উল্লেখ করে চাকরিতে যোগদান করলেও বর্তমানে তিনি শাখা হতে প্রধান কার্যলয়ে পাঠানো তথ্যে নিজ জেলা ঢাকা উল্লেখ করেছেন। তারও ঢাকা শাখায় তিন বছর পার আর মাস খানেক বাকি রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে রাকাবের চেয়ারম্যান মো রইসুল আলম মন্ডল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদরে রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা তাতে সাড়া দেননি। কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "নিয়মের ব্যত্যয় যে একেবারে হচ্ছে না তা নয়। তবে এটা করা হচ্ছে সেবা চালু রাখার জন্য। নিয়ম মেনে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করতে গেলে ব্যাংকের সেবাই পুরো বন্ধ হয়ে যাবে।"
