বাংলাদেশের প্রথম নারী বন্যপ্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকারের প্রয়াণ
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণা ও সংরক্ষণে অগ্রদূত অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকার আর নেই। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ১১টায় ৭৮ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সুপারনিউমেরারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেছেন অধ্যাপক নূরজাহান সরকার। দেশের নারী বন্যপ্রাণীবিদ্যার ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৯৪৮ সালে ঝালকাঠির নলছিটির ভেরনবাড়িয়া গ্রামের পঞ্চায়েত বাড়িতে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। মেধাবী এই শিক্ষার্থী বৃত্তির অর্থে পড়াশোনা করেছেন। শিক্ষাজীবনে কখনো শ্রেণিতে দ্বিতীয় হননি।
তবে শুধু মেধা তাঁকে এত দূর নিয়ে আসেনি। নিজের পছন্দের বিষয়ে এগিয়ে যেতে তাঁকে সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও লড়তে হয়েছে। তখন মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। নূরজাহান সেই প্রচলিত পথ অনুসরণ করেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পড়াশোনা শেষ করেই নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।
এই সিদ্ধান্তে তাঁর পাশে ছিলেন তাঁর মা। মেয়ের লেখাপড়া যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন দৃঢ়। এমএসসি ডিগ্রি শেষ করার আগে মেয়ের বিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার জন্য নূরজাহান সরকার বেছে নেন বন্যপ্রাণীবিদ্যা। সে সময় একজন নারীর জন্য এই বিষয় বেছে নেওয়া ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। বন-জঙ্গলে গিয়ে গবেষণা করা, দীর্ঘ সময় মাঠে থাকা কিংবা দুর্গম এলাকায় কাজ করা নারীদের জন্য সহজ ছিল না। তাই অনেকেই তাঁকে অন্য বিষয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক ড. কাজী জাকের হোসেনের কাছেও শুরুতে বিষয়টি নিয়ে সংশয় ছিল বলে জানা যায়। নূরজাহান যখন বন্যপ্রাণী নিয়ে পড়ার আগ্রহের কথা জানান, তখন তাঁকেও এই পেশার কঠিন দিকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল।
কিন্তু নূরজাহান সিদ্ধান্ত বদলাননি। বরং নিজের আগ্রহের কথা বোঝাতে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান।
একসময় তাঁকে দুই পৃষ্ঠার একটি ইংরেজি লেখা লিখতে বলা হয়। সেখানে তাঁকে জানাতে হয়, কেন তিনি বন্যপ্রাণী নিয়ে পড়তে চান। নূরজাহান তাঁর স্বপ্ন, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা লিখেছিলেন।
এরপর তাঁর সামনে আরও একটি প্রশ্ন রাখা হয়—বন-জঙ্গলে গিয়ে কাজ করতে পারবেন কি না, দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে পারবেন কি না।
নূরজাহানের উত্তর ছিল আত্মবিশ্বাসী। ছোটবেলা থেকেই তিনি গ্রামীণ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের কাছাকাছি বড় হয়েছেন। পাখির ডাক, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁর পরিচিত ছিল। তাই প্রকৃতির কাছে গিয়ে কাজ করার বিষয়ে তাঁর ভয় ছিল না।
সেই সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ও সংরক্ষণযাত্রা।
প্রথমদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের রমনা পার্ক ও বলধা গার্ডেনে তাঁর মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়। সাদা অ্যাপ্রোন ও মাথায় হ্যাট পরে গবেষণার কাজে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। পরে তাঁর কাজ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—বাংলাদেশের নানা প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনি গবেষণা করেছেন।
বন্যপ্রাণী গবেষণা তাঁর কাছে শুধু চাকরি বা একাডেমিক দায়িত্ব ছিল না। এটি ছিল তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ। গবেষণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তিনি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু আইন দিয়ে বন্যপ্রাণী রক্ষা করা সম্ভব নয়। মানুষের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। তাই মাঠে গিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এভাবেই তিনি অনেক মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য পরে ফ্রান্সে যান নূরজাহান সরকার। ১৯৭৪ সালে ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পায়। সে সময় ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যমেও তাঁর কাজ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
দেশে ফিরে ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী করে তুলেছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরে গবেষণা ও সংরক্ষণ কাজে যুক্ত হয়েছেন।
দেশের পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন জার্নালেও তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বন্যপ্রাণী নিয়ে লিখেছেন একাধিক বই। গবেষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সংরক্ষণ কাজেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন–২০১৫'।
অধ্যাপক নূরজাহান সরকারের জীবন শুধু একজন গবেষকের জীবনকাহিনি নয়। এটি বাংলাদেশের নারী বিজ্ঞানীদের এগিয়ে যাওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
একসময় মেয়েদের জন্য বন্যপ্রাণী গবেষণার পথ সহজ ছিল না। সামাজিক বাধা ছিল, ছিল নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা। এসবের মধ্যেও তিনি নিজের পছন্দের বিষয় থেকে সরে যাননি।
তিনি একবার বলেছিলেন, 'মেয়েদের আর মায়েদের মধ্যে থাকে এক অপূর্ব প্রাণশক্তি, যা সব অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পারে।'
তাঁর নিজের জীবনই যেন সেই কথার বাস্তব উদাহরণ।
আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে নারী গবেষকেরা কাজ করছেন। বন্যপ্রাণী গবেষণা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ শিক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণায় তাঁদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তারপরও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাগত বাধা রয়েছে।
অধ্যাপক নূরজাহান সরকারের পথচলা আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি নিয়ে কাজ করার অধিকার সবার। গবেষণার জন্য বন, পাহাড়, নদী কিংবা জলাভূমিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো বৈজ্ঞানিক পার্থক্য নেই। প্রয়োজন সুযোগ, নিরাপত্তা, জ্ঞান এবং কাজ করার ইচ্ছা।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার ইতিহাসে অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকার ছিলেন একজন অগ্রপথিক। তাঁর গবেষণা, শিক্ষকতা, লেখালেখি এবং সংরক্ষণ কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়ান না। তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার পথও তৈরি করেন। একজন গবেষক শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন না। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেন। আর একজন সংরক্ষণকর্মীর কাজ শুধু প্রাণী রক্ষা করা নয়। তিনি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও নতুন করে ভাবতে শেখান।
অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকার তাঁর দীর্ঘ জীবনে এই তিনটি কাজই করেছেন।
তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কাজ রয়ে গেছে। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা থাকবে। তাঁর গবেষণা ভবিষ্যৎ গবেষকদের পথ দেখাবে। আর বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ইতিহাসে তাঁর নাম থেকে যাবে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে।
লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
