সংস্কৃতির শহরে একটি মিলনায়তনও নেই

শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির জেলা হিসেবে খ্যাত নেত্রকোনায় আজও নির্মিত হয়নি অত্যাধুনিক কোনো মিলনায়তন। জেলা শহরের একমাত্র অডিটোরিয়ামটি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় আট বছর আগে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর আর নতুন কোনো সাংস্কৃতিক মিলনায়তন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অনুষ্ঠান আয়োজনের উপযুক্ত স্থান না থাকায় জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রায় ঝিমিয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম।
জানা গেছে, মহুয়া-মলুয়া খ্যাত ময়মনসিংহ গীতিকার উৎসভূমি নেত্রকোনা। বাউল, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, পালা, ঢপ, কিচ্ছা, কবিগান, যাত্রাগানসহ লোকসংস্কৃতির অসংখ্য উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে এ জেলায়।
ত্রিশ বছর আগেও জেলা সদরে উদীচী, শিল্পকলা একাডেমি, শতদল, শিকড়, প্রত্যাশাসহ অন্তত ৩০টি নামিদামি সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় ছিল। যাত্রাপালার সংগঠন ছিল আরও ৭-৮টি। অনুষ্ঠান আয়োজনের রীতিমতো প্রতিযোগিতা হতো এসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। আয়োজন করা হতো মাস বা পক্ষকালব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবের।
সংস্কৃতির এ শহরে ১৯৯৭ সাল থেকে খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করে নেত্রকোনার সাহিত্য সমাজ। প্রতি বছরই পহেলা ফাল্গুনে দেশবরেণ্য একজন কবি বা সাহিত্যিককে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক যতীন সরকার, কবি রফিক আজাদ, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি মহাদেব সাহা, নাট্যকার সেলিম আল-দীন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, লেখিকা রাবেয়া খাতুন, কবি হেলাল হাফিজের মতো বিভিন্ন গুণীজন এ পুরস্কার পেয়েছেন।
কিন্তু শহরের একমাত্র অডিটোরিয়ামটি অনেক আগে থেকেই বন্ধ। ফলে অনুষ্ঠান আয়োজন তো দূরের কথা, রিহার্সেল (মহড়া) করার মতো জায়গাও নেই। হাতেগোনা দু-চারটি ছাড়া বন্ধ হয়ে গেছে বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন। যে কয়েকটি আছে- সেগুলোও মঞ্চ বা মিলনায়তনের অভাবে কোনো নাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারছে না।

নাটকসহ কিছু অনুষ্ঠান অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ মিলনায়তন ছাড়া মঞ্চস্ত করা সম্ভব না জানিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন 'উদীচী'র সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, একটি মিলনায়তনের অভাবে বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা কোনো নাটক মঞ্চস্থ করতে পারছি না। বাইরে প্যান্ডেল তৈরি করে অথবা ঘরোয়াভাবে কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কার্যক্রম ধরে রেখেছি।
জানা গেছে, ১৯৭৯ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা সদরের মোক্তারপাড়া এলাকায় অডিটোরিয়ামটি নির্মাণ করা হয়। নামকরণ করা হয় ময়মনসিংহ গীতিকার বিখ্যাত পালাকাব্যের নায়িকা 'মহুয়া'র নামের অনুকরণে। নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এটি একসময় জেলার সংস্কৃতিকর্মীদের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সভা-সমাবেশ এবং নাগরিক সভারও কেন্দ্র ছিল এটি।
লোকজ-সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন 'শিকড়' এর সভাপতি আ ফ ম রফিকুল ইসলাম আপেল বলেন, মহুয়া অডিটোরিয়ামে এক সময় আমরা প্রায় বছর, মাস বা পক্ষকালব্যাপী উৎসব করেছি। দেশ-বিদেশের অনেক নামি-দামি শিল্পী ও কলা-কুশলীরা এখানে অনুষ্ঠান করেছেন। অনুষ্ঠানের আগে অডিটোরিয়ামের রিহার্সাল কক্ষগুলোতে মাসের পর মাস রিহার্সাল হয়েছে। কিন্তু মিলনায়তনটি পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকে সবই বন্ধ।
নির্মাণের পর জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামটিকে তাদের দাবি করে আদালতে মামলা করে। কিন্তু মামলার প্রেক্ষিতে এটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায় নেত্রকোনা পৌরসভা। এর পর থেকে নেত্রকোনা পৌর কর্তৃপক্ষই মিলনায়তনটির দেখভাল করে। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত নির্মাণ কাজ এবং সংস্কারের অভাবে মাত্র ৩০ বছরের মাথায় এটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ২০১২ সালে পৌর কর্তৃপক্ষ এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।
এদিকে অডিটোরিয়ামটি পরিত্যক্ত ঘোষণার পর জেলা প্রশাসন শহরের মোক্তারপাড়ায় অবস্থিত পুরাতন ও জরাজীর্ণ টিনশেড পাবলিক হলটির কিছুটা সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করে। সংস্কারের পর থেকে সেখানে প্রায় সময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিভিন্ন দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠান এবং কদাচিৎ দু-একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে দেখা যায়। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত মানুষের স্থান সংকুলান হয় না।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাট্যকর্মী সানাওয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, নেত্রকোনায় একটি অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য আমরা বহুবার মানববন্ধন এবং বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেছি। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষের সাড়া পাইনি।
জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, মহুয়া অডিটোরিয়ামের জায়গায় আপাতত পৌরসভার উদ্যোগে একটি অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া সরকারি উদ্যোগেও শহরে আরেকটি অডিটোরিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া শহরের বাইরে শেখ হাসিনা বিশ^বিদ্যালয়ে আরেকটি মিলনায়তন নির্মাণ করা হতে পারে।
নেত্রকোনা পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম খান জানান, মহুয়া অডিটোরিয়াম ভেঙে নতুন একটি অত্যাধুনিক অডিটটোরিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রাথমিকভাবে ছয় কোটি টাকাও বরাদ্দ হয়েছে। খুব শিগগিরই পুরাতন ভবনটি ভাঙার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, শহরে একটি অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু এটি নির্মাণ করার উপযোগী ৮৭ শতক উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যায়নি।