সরকারি চাকরির পরীক্ষায় মৌখিকের নম্বর বাড়ানো কতটা যুক্তিযুক্ত
সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ভাইভার বা মৌখিক পরীক্ষার নম্বর অযৌক্তিকভাবে বাড়ানোর প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করার আগে, আমাদের ছাত্রজীবনের ভাইভা এবং ভাইভায় নম্বর প্রাপ্তি নিয়ে দু'একটা কথা বলা দরকার। সব ডিপার্টমেন্টেই অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় ভাইভা ছিল। সেই ভাইভায় কে, কীভাবে, কত নম্বর পেতে পারে এবং কোন স্যার কাকে কত নম্বর দিতে পারেন, এই ব্যাপারে কিছু স্পেকুলেশনও ছিল।
সবসময় এই পূর্বধারণা ঠিক হতো না, তবে ভুলও হতো না। এর মানে ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শিক্ষকের পছন্দ-অপছন্দ এবং ধারণার একটা প্রভাব ছিল। কোনো কোনো সময় আমরা এও শুনেছি শিক্ষক 'ভাইভা বোর্ডে দেখে নেব' বলে কোনো কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে হুমকিও দিয়েছেন।
কীভাবে শিক্ষকরা মৌখিক পরীক্ষার নম্বরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন? পারেন এজন্য যে, অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার গ্রহণে পরীক্ষকরা কতটা স্বাধীনভাবে বা ইচ্ছেমতো মূল্যায়ন করতে পারবেন, সেটি সম্পর্কে বলে দেওয়া থাকে না। ফলে নম্বর প্রদানে এদিক-ওদিক হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ঠিক এই প্রসঙ্গটাই উঠে এসেছে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ভাইভার নম্বর অনেকটা বাড়ানোর আলোচনায়। আধুনিক রিক্রুটিং সিস্টেমে যেখানে চেষ্টা করা হচ্ছে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব কমানো, সেখানে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে সেই বিষয়টিকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা ভাইভাতে এই নম্বর বৃদ্ধিকে যুক্তিসংগত মনে করছেন না। তাদের মতে, এটি লিখিত পরীক্ষার মেধার মূল্যায়নকে ম্লান করবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করবে। এই নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে একে প্রশ্নফাঁস রোধের কৌশল বলা হচ্ছে। সরকারি যুক্তি হচ্ছে লিখিত পরীক্ষায় প্রতারণা রোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব বন্ধ করা, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও প্রক্সি পরীক্ষার্থীর ব্যবহার ঠেকাতে এই পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
সরকারি চাকরির (১১-২০ গ্রেড) মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ছে, কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় পাসের নম্বর কমানো হচ্ছে। এটা সরকারি চাকরিতে দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিয়োগের উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন নিয়োগের মান উন্নয়নে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এই যুগে দাঁড়িয়ে সরকারের দেওয়া এই যুক্তিগুলো খুবই অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীরা কেন মোবাইল হাতে নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকবেন? আর হাতে কোনো ডিভাইস বা প্রযুক্তি না থাকলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কাজ করবে? পরীক্ষার্থীদের কঠোর স্ক্রুটিনির মধ্যে কেউ প্রক্সি দেওয়ার সুযোগ পাবেন কীভাবে?
ছাত্রছাত্রীরা আশঙ্কা করছেন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, উপস্থিতি ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা যাচাই করতে হলে অবশ্যই ভাইভার গুরুত্ব আছে। কিন্তু ভাইভায় অতিরিক্ত নম্বর থাকলে, লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া একজন মেধাবী প্রার্থীকে ভাইভায় 'কম নম্বর' দিয়ে সহজেই পেছনে ফেলে দেওয়ারও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
লিখিত পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকে বলেই সেই পদ্ধতি অবজেক্টিভ বা পরীক্ষার ধরন নৈর্ব্যক্তিক হয়। সবাই একই প্রশ্নে, একই সময়ে পরীক্ষা দেন।
ভাইভা সম্পূর্ণ সাবজেক্টিভ, যা মূল্যায়নকারীর ব্যক্তিগত পছন্দের ওপরও নির্ভর করতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। তাই বলা হচ্ছে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর যত বাড়বে, ইন্টারভিউ বোর্ডের ক্ষমতাও তত বাড়বে। বাড়বে রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগও।
লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী যে নম্বর পাচ্ছেন, সেই ফলাফলকে, ইন্টারভিউ বোর্ডের সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট দিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নম্বর পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, আর ভয়টা এখানেই।
২০২৪-এর জুলাইতে কোটা সিস্টেম রদ করার জন্য যে কোটাবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল, ভাইভায় নম্বর বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই কোটা সিস্টেমই অন্যভাবে ফিরে আসছে বলে ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
সম্প্রতি ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, তাতে সরকারি চাকরির নিয়োগে আবারও ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে মেধাবী প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, "এক সময়ে ২০১১ সনের আগে নিম্ন গ্রেডের চাকরির পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার সাথে ৩০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা ছিলো। লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ছিলো ৪৫। আর মৌখিক পরীক্ষার পাস নম্বর ছিলো ১৫।
২০১২ সনে আওয়ামী লীগ সরকার এসে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর করে দেয় ৫০। আর মৌখিক নম্বর কমিয়ে করে দেয় ২০ ও পাস নম্বর ১০। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় প্রথমত ৩০% ভাইবা নম্বর অযৌক্তিকভাবে বেশি। আর এই মৌখিক পরীক্ষার ৩০ নম্বর নিয়েই হতো রিক্রুটমেন্ট কমিটির আসল খেলা। অর্থাৎ অন্যায় ও অবিচার। এই ৩০ নম্বরেই রিক্রুটমেন্ট কমিটি তাদের কোনো পছন্দের প্রার্থীকে বেশি নম্বর অর্থাৎ ২৫-২৮ নম্বর দিয়ে নিয়ে নিতে পারতো।
সরকার সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ও পিএসসি'র মতামত নিয়েই এই যৌক্তিক পরিবর্তন এনেছিল যেন কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা রিক্রুটমেন্ট কমিটির আরবিট্রারিনেস বা একছত্র আধিপত্য না থাকে। এখন যদি আবার সেই ২০১২ সনের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা হয় তাহলে জাস্টিস ব্যাহত হবে বলে মনে করি।"
সাবেক সরকারি কর্মকর্তার এই কথারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে সরকারি চাকরিপ্রার্থী সাধারণ ছেলেমেয়েদের কণ্ঠেও। তাঁরা বলছেন, সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গ্রেড ১১-২০ এর ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
কোটা আন্দোলনে সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল। যেখানে দাবি ছিল লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়িয়ে ভাইভার প্রভাব কমানো, সেখানে সরকার কেন উল্টো পথে হাঁটছে, এটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, ধারণা করা যায়।
এর ফলে মেধাবী প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং অন্যদিকে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। লিখিত পরীক্ষায় একজন ভালো করার পর যদি, অপেক্ষাকৃত কম ভালো করা কেউ লবিং করে এগিয়ে আসে, তাহলে একে কি মেধাভিত্তিক নিয়োগ বলা যাবে?
সরকারি কর্মচারীরা যদি দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পান এবং দল দেখে কাজ করেন, তাহলে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়বেন জনগণ। কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে বৈষম্য দুইভাবে হওয়ার আশঙ্কা আছে, এক পক্ষপাত বিবেচনায় দলের লোক বা সমর্থকরা চাকরি পাবেন এবং অন্যদিকে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা বঞ্চিত হতে পারেন।
তাহলে কি চাকরিপ্রার্থী ও ছাত্রছাত্রীরা ভাইভার বিরুদ্ধে? না, ঠিক তা নয়, তারা চাইছেন, এমন একটি নিয়োগ পদ্ধতি যেখানে বাছাই করার সিস্টেমটি থাকবে স্পষ্ট এবং প্রতিযোগিতামূলক। অন্যভাবে বলা যায় ভাইভার নম্বর দেওয়ার পদ্ধতিটি হবে স্বচ্ছ এবং পদ্ধতিগত।
যিনি ভালো পরীক্ষা দেবেন, তিনি অবশ্যই ভাইভায় বেশি নম্বর পাবেন। বিষয় উপস্থাপনে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও পরিস্থিতি সামলানোর যোগ্যতা আছে, তিনি বেশি নম্বর পাবেন। কিন্তু পরীক্ষার্থীর সেই যোগ্যতা কাগজে-কলমে প্রমাণিত হতে হবে।
এই যোগ্যতা প্রমাণের উপায় হচ্ছে নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে একটি যথাযথ কাঠামো নির্ধারণ করা। সবাই যেন বুঝতে পারেন কাকে, কেন, বেশি নম্বর দেওয়া হলো। যেহেতু সরকার ভাবছে সরকারি চাকরির নিয়োগ দিতে হলে ভাইভা গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভাইভা গ্রহণের পথ ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে।
আমরা দেখতে পারি ভারতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়ম কী? এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। "ভারতের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা ইউপিএসসির ব্যবস্থায় সাক্ষাৎকার বোর্ডকে প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার নম্বর ও শ্রেণিগত পরিচয় জানানো হয় না। সাক্ষাৎকারের আগে প্রার্থীদের বোর্ডে দৈবভাবে বণ্টনের ব্যবস্থাও রয়েছে। এর ফলে লিখিত পরীক্ষার ফল দেখে বোর্ডের সদস্যদের আগে থেকেই কোনো ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে। ইউপিএসসি আবার সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের লিখিত, ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা এবং মোট নম্বর প্রকাশ করে।" (প্রথম আলো)
সরকার কেন মনে করছে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য দক্ষ ও যোগ্য মানুষ বাছাই করতে, ভাইভার নম্বর বাড়াতে হবে? যদি তাই মনে করে তাহলে মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের ও মূল্যায়নের পদ্ধতিও কাঠামোবদ্ধ হতে হবে। নয়তো স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের যে অভিযোগ, ভয় এবং অনুমান, তা সত্যে পরিণত হবে।
ভাইভার নম্বর বেশি হলে তদবির, ঘুষ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার শঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁরা এও মনে করেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও সুশাসন বজায় রাখতে ভাইভার নম্বর কমিয়ে লিখিত পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি ভাইভাকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা দরকার।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
