‘চোখের সামনেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে’: ধেয়ে আসছে শক্তিশালী এল নিনো, রেকর্ড উষ্ণতার সতর্কতা জাতিসংঘের
এল নিনো 'চোখের সামনেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে' বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো গত অন্তত ১ হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল তাপমাত্রার আগের সব রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। প্রশান্ত মহাসাগরে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ে এবং বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় এবার এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
সোমবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর কেন্দ্রস্থলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ২০১৫ সালে স্যাটেলাইট তথ্য সংগ্রহের যুগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বিচ্যুতি ছিল ৩ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবারের এল নিনো এখনও চূড়ায় পৌঁছায়নি।
ইতোমধ্যে এর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, আর ভারতে দুর্বল হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত। সামনে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় বন্যার তীব্রতা বাড়তে পারে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটও চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বাড়াচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এবারের এল নিনোকে 'অবিশ্বাস্য মাত্রার' এবং 'গডজিলা-স্তরের' ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত আগস্টে জানিয়েছে, এল নিনোর কারণে আগামী বছর প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
১৪টি ভিন্ন জলবায়ু মডেলের গড় পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরে এল নিনোর তীব্রতা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
জলবায়ু বিশ্লেষক জিক হাউসফাদার জানিয়েছেন, প্রবাল, গাছের 'রিং' ও ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক হাজার বছরে কোনো এল নিনো এতটা শক্তিশালী হয়নি। সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে তাকে এল নিনো হিসেবে ধরা হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এল নিনোর চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে জলবায়ু সংকটের প্রভাবও আরও তীব্র হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, 'আমাদের চোখের সামনেই এল নিনো আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞান এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের সুযোগ রাখছে না—পৃথিবী এমন এক পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছে, যা আগে দেখা যায়নি। তাপমাত্রাও দ্রুত বাড়ছে।'
তিনি বলেন, 'বিশ্ব এখন চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই মুহূর্তে লড়াইটা বাড়তে থাকা ঝুঁকি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের অঙ্গীকারের মধ্যে। আমাদের এই লড়াইয়ে জিততে হবে এবং মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে।'
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, 'এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। খরা ও বন্যার কারণে এরই মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব আরও বাড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।'
তিনি বলেন, 'ডব্লিউএমওর ৫০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ন্যাশনাল মিটিওরোলজিক্যাল অ্যান্ড হাইড্রোলজিক্যাল সংস্থাগুলোর সঙ্গে এত বড় পরিসরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এসব সংস্থাই পূর্বাভাস ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছে। তাই আমাদের হাতে সময় নেই।'
ডব্লিউএমওর এল নিনো বিষয়ক পূর্বাভাসকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের মডেলগুলোর সমন্বিত ফলের ভিত্তিতে এসব পূর্বাভাস তৈরি করা হয়।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এল নিনো এখন পুরোপুরি সক্রিয় এবং আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে 'অত্যন্ত শক্তিশালী' পর্যায়ে যেতে পারে। এর ফলে বন্যা, খরা ও চরম তাপমাত্রার মতো বড় ধরনের প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
জুলাই ও আগস্টের শুরুর দিকে কয়েকটি এলাকায় সমুদ্রের তলদেশের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি ছিল।
যুক্তরাজ্যের এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ক্রিস জাকারিনি বলেন, 'বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার কারণে খাদ্যের দাম বেড়েছে, যার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে দরিদ্র মানুষের ওপর। শুধু আমদানি করা খাবার নয়, দেশে উৎপাদিত খাদ্যও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।'
তিনি বলেন, 'পাঁচটি তাপপ্রবাহ ও ব্যাপক খরার পর ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের কৃষকরা ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফসল পেয়েছেন। অথচ কোনো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই বছরগুলোই হয়তো ভালো সময় হিসেবে বিবেচিত হবে। দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কয়েক বছর পরপর এল নিনো এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলবে।'
