ফেনীর নুসরাত হত্যা: হাইকোর্টে ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১০ জন খালাস
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় মূল আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া চারজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০জনকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
তাছাড়া সঠিক রায় দিতে না পারায় এই মামলায় নিম্ন আদালতের রায় ঘোষণাকারি বিচারককে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে বলেন হাইকোর্ট।
আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের নিষ্পত্তি করে সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা আসামিরা হলেন-সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন- উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ এবং ইফতেখার হোসেন রানা।
খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন- মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, আফসার উদ্দিন, মাকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল এবং কামরুন নাহার মনি।
আদালতে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো.রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, 'এই ১৬ জন নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে আদালত দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন। তারা হলেন এই মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ-দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।'
তিনি বলেন, 'এই রায়ের পরে আদালত নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়ের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশিদ—তার সম্পর্কে আদালত বলেছেন, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অনেকটা মাইন্ডলেস সেন্টেন্স। অর্থাৎ, আদালতে বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'তিনি [নিম্ন আদালতের বিচারক] এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার, কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার, কী কতটুকু মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা-সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।'
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং-অর্থাৎ, ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সে ক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন।'
তিন আসামির পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, 'এই মামলায় বিচারিক আদালতে ১৬ মৃত্যুদণ্ডের রায় পেয়েছিল। ১০ জনকে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ বেকসুর খালাস দিয়েছেন। চারজনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন, আর দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।'
তিনি বলেন, 'মাননীয় হাইকোর্ট বলেছেন, বিচারিক আদালত এইভাবে নির্বিচারে ফাঁসির রায় দেওয়ায় প্রতিটা পরিবারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। এই জন্য বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে বলেছেন।'
শিশির মনির বলেন, 'আমার আসামি ছিল তিনজন। মনি, জুবায়ের ও মোহাম্মদ শামীম। মোহাম্মদ শামীম ও মনি খালাস পেয়েছে, আর জুবায়েরকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন আদালত।'
তিনি বলেন, 'আমরা জুবায়েরের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করব। আমরা একটি বড় আর্গুমেন্ট করেছিলাম, সেই আর্গুমেন্টের জবাব রাষ্ট্রপক্ষ দিতে পারেনি। ঘটনার ওই প্রেমিসিসে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এই সিসিটিভি ক্যামেরার ছবি আজও সেখানে আছে। ছয় বছর আগেও সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু প্রসিকিউশন পক্ষ কিংবা ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ওই সিসিটিভি ক্যামেরাটা জব্দ করেনি। সিসিটিভি ক্যামেরাটাকে আদালতের সামনে উপস্থাপনও করেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'এই প্রেমিসিসে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজটা যদি আদালতের সামনে আসত; তাহলে সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যেত কে, কাকে, কোথায় কী করেছে। কীভাবে, কে, কাকে মেরেছে কিংবা মারেনি। কিন্তু একটা রহস্য থেকে গেল, নুসরাত কী করে সাইক্লোন সেন্টারের উপরে গেল, সেখানে আগুন লাগল, আর কেউই শুনল না কেন।'
এর আগে, গত ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষ পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) থেকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ শুনানি শুরু করে।
এর আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয়াদি হাইকোর্টে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনতে গত ১০ জুন হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট ওই বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। গঠিত দ্বৈত বেঞ্চটি গত ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এই মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় একই বছরের ২৭ মার্চ। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে নুসরাতের মা শিরীন আখতার মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর অধ্যক্ষের অনুগত কয়েকজন ক্যাডার তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালায়। ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজের সঙ্গে পরামর্শ করার পর ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী ও ফেনীতে এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
