সংকটে থাকা ব্যবসায় ঋণ দিতে প্রণোদনা তহবিল থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা চায় ৩৮ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ৩৮টি ব্যাংক। রোববার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বন্ধ ও সংকটে পড়া কারখানা পুনরায় চালু করতে, গত মে মাসে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে—৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ওপর সুদের হার নিয়ে—বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। সুদের হারের এই বিরোধ নিষ্পত্তির পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ঋণ বিতরণ শুরুর পথ সুগম করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতি সুদহারের (পলিসি রেট) সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে প্রদান করবে। ইতঃপূর্বে প্রস্তাবিত ৯% সুদের হারের চেয়ে এটি বেশি। একাধিক ব্যাংকের ট্রেজারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, পূর্বের নির্ধারিত সুদের হারই ছিল মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
পলিসি রেট প্লাস ৫০ বেসিস পয়েন্টের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে নীতি সুদহার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই তহবিলের খরচেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করতে পারবে। প্রায় দুই বছর পর গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর পর—বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৯.৫%। ফলে এই প্রণোদনা তহবিলের বর্তমান সুদের হার দাঁড়াচ্ছে ১০%।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই ঋণ একবারে না দিয়ে তিন বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। যেমন কোনো ব্যাংক যদি তাদের কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকা চায়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ঋণ দিতে পারে এমন উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মিল ঘটিয়ে দেবে—যা উল্লিখিত সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর টাকা দীর্ঘ সময় আটকে থাকবে বলে যে দাবি উঠেছিল, এই কাঠামো সেটির নিরসন করেছে।
এর আগে সুদ হারের এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহমেদের সভাপতিত্বে, ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানদের সঙ্গে দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। ওই বৈঠকদ্বয়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাতসীমা (এডিআর) ৬০-৭০% অথবা ৭০-৮০% রাখা নিয়ে মতবিভাজন ছিল।
সুদের হার ছাড়াও ট্রেজারি কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই কর্মসূচির আওতায় প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে কোনো তারল্য সহায়তা (লিকুইডিটি ব্যাকস্টপ) পাওয়া যাবে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নগদ অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রণোদনা প্যাকেজের অধীনে থাকা অংশ—রেপো অর্থায়নের জামানত বা কোল্যাটারাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
একই সঙ্গে এই তহবিল তাদের হিসাবের খাতায় কীভাবে নথিভুক্ত করা হবে, তা নিয়েও বিভ্রান্তিতে রয়েছেন ব্যাংকাররা। শীর্ষস্থানীয় একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, "সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রেখে রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করে থাকে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে রিভার্স রেপোর মাধ্যমে নগদ টাকা ধার নেয়। তবে এটি তেমনটি নয়।"
আরেকজন জ্যেষ্ঠ ট্রেজারি কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো একটি নির্ধারিত রিটার্ন পেয়ে থাকে। কিন্তু এই স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকে যাওয়া অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: ব্যাংকগুলো কি এটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেওয়া ঋণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবে?
টিবিএসকে অপর এক ট্রেজারি কর্মকর্তা জানান, "সম্ভবত এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে 'প্লেসমেন্ট' হিসেবে রেকর্ড করা হতে পারে।"
৬০,০০০ কোটি টাকার প্যাকেজের মূল কাঠামো
মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হিসেবে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ব্যাংকিং সংকট, জ্বালানি ঘাটতি এবং মূলধন সংকটে পড়া বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসা পুনরায় চালু করার জন্য।
বাকি তহবিলের মধ্যে ৫,০০০ কোটি টাকা এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প); ১০,০০০ কোটি টাকা কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি; ৩,০০০ কোটি টাকা কৃষি-হাব গঠন এবং ৩,০০০ কোটি টাকা রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্যাকেজের অবশিষ্ট ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে সরাসরি সরবরাহ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের এই নিজস্ব অংশটি প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইনান্সিং, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ঋণ, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বেকারদের জন্য ঋণ এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামীণ ঋণের জন্য ব্যবহার করবে।
সুদের হার
তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে রেপো রেটের চেয়ে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি হারে অর্থ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক—যা বর্তমানে ১০%। তবে ব্যাংকগুলো যখন তাদের গ্রাহকদের জন্য তহবিল উত্তোলন করবে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে মাত্র ৪% চার্জ নেবে। আর ব্যাংকগুলো চূড়ান্ত গ্রাহক বা ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৯% পর্যন্ত সুদ বা মুনাফা আদায় করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু খাত যেমন—স্টার্টআপের ক্ষেত্রে সুদের হার আরও কম হতে পারে, যা সর্বনিম্ন ৪% পর্যন্ত হতে পারে। এই সুদের যে ব্যবধান তা সরকার বাজেটে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করবে।
প্রণোদনার মূল লক্ষ্য
প্রণোদনা প্যাকেজটির মূল লক্ষ্য হলো, বিগত কয়েক বছরে স্থবির হয়ে পড়া চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা। শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে এই মেগা প্যাকেজের আওতায়, বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
