নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ, জব্দ সম্পদ ছাড়: হরমুজ খুলতে একগুচ্ছ শর্ত ইরানের; বাড়ছে জটিলতা
ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা শনিবার মোহাম্মদ বাঁকের জোলকাদার একগুচ্ছ কঠোর শর্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে এসব শর্ত পূরণ করতে হবে। তার এই বক্তব্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান জোলকাদর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রণালিটি পুনরায় খোলার জন্য ৬টি শর্ত তুলে ধরেছেন। শর্তগুলো হচ্ছে—ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করা, তেহরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড় করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের এসব শর্ত মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলেই কেবল নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে।
জোলকাদরের এই বিবৃতি এমন এক সময়ে এল, যখন ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করছে। দুই দেশের মাঝখানে এই প্রণালি অবস্থিত। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়।
জোলকাদরের শর্তগুলোর তালিকা এই প্রত্যাশাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে যে, ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি হলেই হরমুজ প্রণালিতে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হবে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমবে।
একই সঙ্গে এসব শর্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কমাতে চান, তাহলে ইরানের শর্তগুলো বিবেচনা করতে হতে পারে।
জোলকাদরের বক্তব্যের আগেই শনিবার ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি খুব শিগগির খুলছে না। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, প্রণালিটি পুনরায় খোলা "ইরান-ওমান আলোচনার ওপর নির্ভরশীল নয়''।
ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মোহেবির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা নির্ভর করবে "ইরানের শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মেনে নেওয়ার ওপর''। তবে তিনি এসব শর্তের বিস্তারিত জানাননি। শুধু বলেছেন, ইরান ও ওমান কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বরাত দিয়ে তাসনিমের খবরে বলা হয়, ইরান ও ওমান একটি সমঝোতার "খুব কাছাকাছি" পৌঁছে গেছে।
তবে আরাগচির ভাষ্য- "হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা আরও কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতা লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।"
জুনের ওই চুক্তি ছিল একটি "সমঝোতা স্মারক", যা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে সম্পন্ন হয়েছিল। এতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর তেলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির ভাষা ছিল অস্পষ্ট। ফলে এর অর্থ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোর জন্য ওমানের উপকূল ঘেঁষে একটি দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারের পক্ষে ছিল, যাতে সেগুলো ইরানের জলসীমা এড়িয়ে যেতে পারে। জবাবে ইরান ওই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে এবং কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। এর পরপরই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করে।
আরাগচি বলেন, "আমেরিকানরা হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন নতুন নৌপথ চালু করতে চেয়েছিল। আমাদের দেশের পক্ষ থেকে সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা প্রণালিটির ওপর ইরানের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। তাই সমঝোতা স্মারকের কোনো লঙ্ঘন কিংবা হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।"
তিনি জানান, ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির ভেতর দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্ধারণ করতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীও আলোচনা করছে।
ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রাজ জিম্ত বলেন, মোহেবি ও আরাগচির মন্তব্য থেকে বোঝা যায়— ইরানের দৃষ্টিতে ওমানের সঙ্গে আলোচনায় "সর্বোচ্চ" যা হতে পারে, তা হলো ভবিষ্যতে কীভাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, সেই পদ্ধতি ঠিক করা।
জিম্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান ও ওমান প্রণালিটি নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে একমত হলেও "এটা স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ সমঝোতার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতিগুলো পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তেহরান এসব বাস্তবায়নে সম্মত হবে না''। এর মধ্যে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরুও করা রয়েছে।
শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির একটি ট্যাংকার ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কোম্পানিটি শুক্রবার জানিয়েছিল, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জলপথটিতে তাদের অন্তত ১৫টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় জাহাজের ক্রুদের মধ্যে একজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন।
সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন মাত্র ১২টির কিছু বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত।
