ইরান যুদ্ধ যেভাবে ঘরোয়া রাজনীতিতে ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলেছে
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এবং এই সংঘাতের সময়ে দেশটির বিরুদ্ধে ক্রমাগত হুমকি ও তা থেকে পিছু হটার ঘটনাগুলো— এক রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘরোয়া এজেন্ডাকে তছনছ করে দিচ্ছে।
এই যুদ্ধের জেরে মার্কিন নাগরিকরা এখন জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের সম্মুখীন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা কংগ্রেসের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এমন অজনপ্রিয় যুদ্ধকে সমর্থন করতে ও তহবিল জোগাতে বাধ্য হচ্ছেন, ভোটাভুটির মাধ্যমে যার অনুমোদন তারা দেননি। এদিকে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, শেষ না হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকা এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের আশঙ্কাজনক পতন হয়েছে।
ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে এবং মার্কিন জনগণের কাছে তাঁর এজেন্ডা তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের রাজ্যগুলো সফর শুরু করবেন। যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প বর্তমানে যে তিনটি অভ্যন্তরীণ বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা নিচে দেওয়া হলো:
জ্বালানি তেলের দামে নাভিশ্বাস
ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে মার্কিন নাগরিকরা প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের জন্য বর্তমানেই সবচেয়ে বেশি দাম গুনছেন।
মোটর ক্লাব ট্রিপল এ'-র তথ্য অনুযায়ী, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিন বা পেট্রলের জাতীয় গড় দাম ছিল ৪.১০ ডলার। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে— আমেরিকার পেট্রোল পাম্পে গাড়িচালকদের খরচ ৩৭ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে তৈরি হওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে এটি আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা সামাল দিতে ট্রাম্পকে শুরু থেকেই হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, এই সংঘাতের কারণে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ধারণার চেয়ে অনেক কম রয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ হলেই তেলের দাম "দ্রুত কমে যাবে"।
সোমবার ট্রাম্প তেল কোম্পানিগুলোর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বড়াই করে বলেন, তাঁর নীতির কারণেই কোম্পানিগুলো অনেক বেশি লাভের মুখ দেখেছে।
সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্টে তিনি শেভরন ও এক্সন-এর রেকর্ড মুনাফার কথা উল্লেখ করে—কোম্পানি দুটিকে সাধারণ মানুষের জন্য তেলের দাম কমানোর তাগিদ দেন। তিনি লেখেন, "অন্যান্য তেল কোম্পানির ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। ভোক্তাদের জন্য তেলের খুচরা পর্যায়ের দাম এখনই কমান!"
জনমত জরিপে আশঙ্কাজনক পতন
আধুনিক যুগে ট্রাম্পই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি মার্কিন জনগণের সমর্থন ছাড়াই দেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছেন, যা গত মে মাসের তুলনায় কিছুটা বেশি। এছাড়া সাম্প্রতিক সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে ৭৪ শতাংশ আমেরিকান—যার মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ রিপাবলিকানও রয়েছেন—বলেছেন যে, আর্থিক ক্ষতি বা মার্কিন হতাহতের দিক থেকে বিবেচনা করলে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও, এই সংঘাত ট্রাম্পের দেওয়া "চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ"-এর প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প অবশ্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগকে সাময়িক বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অতীতের সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করে তিনি মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির সংখ্যাকেও খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
সোমবার ট্রাম্প এক লেখায় দাবি করেন যে, তাঁর নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রচারিত যেকোনো জরিপই আসলে "উগ্র বামপন্থীদের ভুয়া জরিপের উপাত্ত"।
রাজনৈতিক ঝুঁকি
মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই রিপাবলিকান রাজনীতিবিদরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন, এমতাবস্থায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও সংঘাতটি দ্রুত ও স্পষ্টভাবে শেষ করার জোর তাগিদ দিচ্ছেন।
সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করে, তখন গত মাসে হাউস স্পিকার মাইক জনসন বলেছিলেন, "আমাদের এটি দ্রুত গুটিয়ে আনতে হবে।"
ট্রাম্প কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই যুদ্ধের কারণেই কংগ্রেস সদস্যদের কাছে আরও শত শত কোটি ডলারের নতুন তহবিলের অনুমোদন চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত সপ্তাহে সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে এর কয়েক দিন পরেই তাদের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সংঘাতটি আসলে কোন দিকে মোড় নিচ্ছে— তা নিয়ে তারা নিজেরাও সন্দিহান।
এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে গত রোববার লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডি বলেন, "প্রেসিডেন্টের আবার নতুন করে (ইরানের ওপর) বোমা হামলা শুরু করা উচিত কি না— তা আমার জানা নেই, কারণ আমার কাছে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য নেই। এটা একটা বড় সমস্যা, কারণ এটি ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি করবে। এতে জ্বালানির দাম বাড়বে এবং আমেরিকান জনগণের ওপর ব্যাপক মূল্যস্ফীতি চেপে বসবে। এর সবগুলোই যন্ত্রণাদায়ক।"
ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের প্রতি সমর্থনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে।
মিডিয়া ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান অ্যাডইম্প্যাক্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেইন রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান গ্রুপ 'মেজোরিটি ফরওয়ার্ড' রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স— ট্রাম্পকে এ যুদ্ধের জন্য "ব্ল্যাঙ্ক চেক" (অবাধ স্বাধীনতা) দিয়েছেন বলে অভিযুক্ত করে বিজ্ঞাপন প্রচারে ১৫ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
