অ্যালগরিদমের যুগে গজল: সোশ্যাল মিডিয়ায় ফারসি কবিতার পুনর্জন্ম
তেহরানের কোনো এক প্রান্ত। এক মা সবে বিমানবন্দর থেকে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরলেন। চব্বিশ বছরের সদ্য স্নাতক মেয়েটা দেশ ছেড়েছে। হয়তো চিরকালের জন্যই। কোনো ক্যাপশন লিখলেন না মা। সোজা ইনস্টাগ্রাম খুলে একটা স্টোরি শেয়ার করলেন। ফাঁকা স্ক্রিনে ফারসি ক্যালিগ্রাফিতে ফুটে উঠল সাতশো বছরের পুরোনো এক কবির দুটি পঙ্ক্তি। আর কিচ্ছু না।
'দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার কথা লোকে কতভাবেই না বলে
আমি নিজের চোখেই আমার প্রাণকে চলে যেতে দেখলাম।'
পঙ্ক্তিটি শেখ সাদির (১২১০–১২৯১)। তার 'দিওয়ান'-এর ২৬৮ নম্বর গজল থেকে নেওয়া। সেই বিখ্যাত গজল, যার শুরুতেই বলা হয়েছে—'হে কাফেলার দলপতি, একটু ধীরে চলো; আমার প্রাণের স্বস্তি যে আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছে।'
এই বিখ্যাত গজলটির শুরু হয়েছে এভাবে: 'হে কাফেলার দলপতি, একটু ধীরে চলো; আমার প্রাণের স্বস্তি যে বিদায় নিচ্ছে'। কবির নাম ওই মায়ের জানা থাকতে পারে, না-ও পারে। কিন্তু তিনি জানেন, 'আমার প্রাণ' (আমার আদরের ধন) শব্দবন্ধের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে, তা তিনি নিজের ভাষায় কিছুতেই বলে উঠতে পারতেন না। তার কাছে চোখের সামনে মেয়ের দেশ ছাড়া আর নিজের শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া একই একই ব্যাপার।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই স্টোরি শেয়ার হলো ডজন ডজন বার। শেয়ার করলেন বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, এমনকি অচেনা মানুষেরাও—যারা তার সমব্যথী। এভাবেই তেরো শতকের একটি গজলের দুটো লাইন কয়েক ঘণ্টার জন্য হয়ে উঠল ইন্টারনেটের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এক টেক্সট।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এভাবেই এক অদ্ভুত সুন্দর রূপে পুনর্জন্ম ঘটছে ফারসি কবিতার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে বা চামড়ায়-বাঁধানো মোটা বইয়ের পাতায় নয়। ফারসি কবিতা নতুন জীবন পাচ্ছে ইনস্টাগ্রাম স্টোরি, টিকটক রিল আর টেলিগ্রাম চ্যানেলে। এমন এক প্রজন্মের হাত ধরে এই ফেরা, যারা হয়তো কবির নামটাই জানে না। কিন্তু তারা এটুকু নিশ্চিত জানে, ওই শব্দগুলো তাদেরই মনের কথা বলছে। এই প্রাচীন কবিতাগুলো ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ। এমন অভাবনীয় গতিতে সেগুলো এখন ছড়িয়ে পড়ছে, যা এদের স্রষ্টারা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারেননি।
প্রেম, বিরহ এবং স্ক্রলিং
ইরানের কোনো তরুণ বা তরুণী যখন বোঝাতে চান যে তিনি প্রেমে পড়েছেন, কিংবা তার হৃদয় ভেঙেছে, অথবা তিনি প্রতারিত হয়েছেন—তখন তারা স্রেফ কয়েকটা শব্দ টাইপ করে না। তারা খুঁজে বের করেন জুতসই কোনো পঙ্ক্তি। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে জুড়ে দেন কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের নাটকীয় আবৃত্তি। কখনো এমন কোনো পঙ্ক্তি পোস্ট করেন, যেখানে ভাষার জাদুটুকুই সব। কখনো ফাঁকা স্ক্রিনে শুধুই কয়েকটি শব্দ ভেসে থাকে, আবার কখনো কোনো ছবি বা ছোট্ট ভিডিওর ওপর আঁকা থাকে ক্যালিগ্রাফি—সাথে বাজতে থাকে নরম কোনো সুর। তারা যে কবির দ্বারস্থ হচ্ছেন, তিনি হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী আগের মানুষ। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল কথা। পুরোনো শব্দগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন এক তীব্র আবেগ, নতুন কোনো শব্দের পক্ষে যার ধারেকাছে পৌঁছানোও সম্ভব নয়।
বছরের পর বছর ধরে কবিতা আটকে ছিল নিছক সাহিত্যপ্রেমী আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের গণ্ডিতে। সেই শৃঙ্খল ভেঙে কবিতা আজ একেবারে নতুন প্রজন্মের মুঠোয়। ছাত্রছাত্রী, ট্যাক্সিচালক, ইনফ্লুয়েন্সার, অ্যাক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে ভগ্নহৃদয় কিংবা আশাবাদী মানুষ—সবাই আজ কবিতাকে আপন করে নিয়েছে।
বলখের মহান সুফি সাধক রুমির (১২০৭-১২৭৩) কথাই ধরা যাক। ফারসি ভাষার সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনো সবচেয়ে বেশি শেয়ার হওয়া প্রেমের কবিতাগুলো তারই গজল:
'প্রেমহীন যে জীবন, তাকে জীবনের খাতায় রেখো না
প্রেমই তো অমৃতধারা; তাকে হৃদয় ও আত্মায় বরণ করে নাও।'
'দিওয়ানে শামস'-এর ১১২৯ নম্বর গজল। রুমি এটি লিখেছিলেন আধ্যাত্মিক দীক্ষা হিসেবে: প্রেমের প্রতি আহ্বান, যা কিনা জীবনের সঞ্জীবনীর মতোই। আজ ইনস্টাগ্রামে এর ছড়াছড়ি। সূর্যাস্তের ছবির নিচে ক্যাপশন হিসেবে, দুটো গানের ফাঁকে স্টোরির টেক্সটে, কিংবা মন-খারাপ-করা কোনো রিলের ভয়েসওভার হিসেবে বারবার ঘুরেফিরে আসছে এই পঙ্ক্তি। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা আধ্যাত্মিক গূঢ় অর্থ হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে পঙ্ক্তিটির অনুরণন কমেনি।
অথবা ধরা যাক ইরানের সবচেয়ে নন্দিত আধুনিক নারী কবি ফরুগ ফারোখজাদের (১৯৩৪-১৯৬৭) কথা:
'যদি সহস্রবারও এই জীবন ফিরে পাই,
তবে বারবার শুধু তোমাকেই চাই, তোমাকেই চাই।'
তার 'আসির' (বন্দী) কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া এই পঙ্ক্তি। প্রেমে পড়া এক তরুণী হিসেবে কথাগুলো লিখেছিলেন ফারোখজাদ। এই লেখার তীব্রতা ১৯৫০-এর দশকে পুরো ইরানি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ ফারসি ভাষার সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক ক্যাপশন হিসেবে এটি ঘুরে বেড়ায়। বাগদানের ঘোষণা, বিবাহবার্ষিকীর পোস্ট, কিংবা প্রিয়জনের নাম ট্যাগ করা কোনো স্টোরিতে এটি এখন নিয়মিত দৃশ্য। যারা এই পঙ্ক্তি শেয়ার করে, তাদের বেশির ভাগই জানে না যে কথাগুলো ফারোখজাদের। একটা সময় এই দুটো লাইন যে গোটা দেশকে চমকে দিয়েছিল, সে কথা জানা তো অনেক দূরের কথা! কিন্তু এর অকৃত্রিম তীব্রতা ঠিকই নাড়া দিয়ে যায় তাদের। আধুনিক যুগে উদাসীন মানুষের মধ্যে এই পঙ্ক্তির এমন নির্লজ্জ নিবেদন একে এতটা শক্তিশালী করে তুলেছে।
আর যখন কোনো মানুষ এমন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হন, যা সামলে ওঠার পর তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে পারেন না যে সে এখনো টিকে আছে, তখন তারা আশ্রয় খোঁজেন শাকিবি ইসফাহানির (১৫৫৭-১৬১৪) একটি পঙ্ক্তিতে। এই কবিতার জনপ্রিয়তার তুলনায় কবির নিজের পরিচিতি অনেক কম:
'বিরহের দীর্ঘ রাতগুলো সয়ে আজও আমরা বেঁচে আছি,
কখনো ভাবিনি আমাদের মাঝে এতটা সহনশীলতা আছে।'
শোক, নির্বাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, কিংবা স্রেফ দুঃসময়ে টিকে থাকার পাহাড়সম চাপ—এসব যারা জয় করে বেঁচে আছেন, তাদের কাছে এই পঙ্ক্তি দুটো হয়ে উঠেছে এক রকমের ধর্মনিরপেক্ষ প্রার্থনা। এর মাঝে কোনো বিজয়োল্লাস নেই, নেই কোনো আস্ফালন। আছে কেবল এখনো টিকে থাকার নীরব বিস্ময়। যারা এই পঙ্ক্তি শেয়ার করছেন, তাদের বেশির ভাগই জানেন না শাকিবি ইস্পাহানি কে। এই বিষয়টিই প্রমাণ করে, কবিতাটি আজ তার স্রষ্টাকে সর্বজনীন সম্পদ ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে।
সাতশো বছর পুরোনো প্রতিবাদের স্বর
কবিতা যদি ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাষা হয়, তবে তা সমান সাবলীলতায় হয়ে ওঠে সম্মিলিত ক্ষোভের ভাষাও। ইরানে এই দুটি বিষয় কখনোই খুব একটা আলাদা ছিল না। যে ঐতিহ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব প্রেমের কবিতার জন্ম দিয়েছে, সেই ঐতিহ্য থেকেই উঠে এসেছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিছু প্রতিবাদী সাহিত্য। যখনই স্বৈরতন্ত্র নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, রাজপথ হয়ে ওঠে উত্তাল, তখনই প্রাচীন সব কবিতার পঙ্ক্তি নতুন করে প্রতিবাদের স্লোগান হিসেবে মুঠোফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় জ্বলে ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শেয়ার হওয়া পঙ্ক্তিটি সেইফ-ই ফারগানির। তেরো শতকে এই কবি কবিতাটি লিখেছিলেন মোঙ্গল আগ্রাসনের ধ্বংসলীলার যুগে:
'ন্যায়পরায়ণদের ন্যায়বিচারই যখন এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী হয়নি
তখন তোমাদের মতো স্বৈরাচারীদের জুলুমও কেটে যাবে।
এই ভূখণ্ডে কত সিংহের গর্জনই তো এল আর মিলিয়ে গেল
তোমাদের কুকুরদের এই ঘেউ ঘেউও একদিন ঠিকই থেমে যাবে।'
মোঙ্গল অত্যাচারীদের উদ্দেশে ফারগানি এই কাসিদা রচনা করেছিলেন। তাদের তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন—বৈধ আর মহান শাসকদের শৌর্যবীর্যই যেখানে ম্লান হয়ে গেছে, সেখানে তাদের এই অবৈধ রাজত্ব যে আরও বেশি ক্ষণস্থায়ী প্রমাণিত হবে। কবিতার অবিরাম পুনরাবৃত্তি—'শোমা নিজ বোগজারাদ' (তোমাদেরও দিন ফুরাবে)—হাতুড়ির মতো আঘাত হানতে থাকে প্রতিটি স্তবকে। শত শত বছর পর আজও যখনই ইরানিরা নিপীড়নের মুখোমুখি হন, তখনই এই পঙ্ক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের স্টোরিতে ফিরে আসে। এর জন্য আলাদা করে কোনো পাদটীকা বা প্রেক্ষাপটের প্রয়োজন হয় না। অর্থটি অত্যন্ত স্পষ্ট: স্বৈরতন্ত্র চিরকাল টেকে না।
অস্থিরতার দিনগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি পঙ্ক্তি অবধারিতভাবে ফিরে আসে। এটি সাংবিধানিক বিপ্লবের কিংবদন্তি কবি ও সুরকার আরেফ কাজভিনির (১৮৮২-১৯৩৪) লেখা:
'মাতৃভূমির তরুণদের রক্তে ফুটেছে টিউলিপ
তাদের সাইপ্রেস-সম দীর্ঘ দেহের শোকে, সাইপ্রেস গাছগুলোও আজ নুয়ে পড়েছে।'
কাজভিনি এই তাসনিফ (শিল্পিত গান) লিখেছিলেন ইরানের সাংবিধানিক আন্দোলনের প্রথম শহীদদের স্মরণে। এর চিত্রকল্পের শেকড় প্রোথিত আছে এক গভীর পৌরাণিক মিথের ভেতর। 'শাহনামা'য় আছে, নিহত রাজপুত্র সিয়াভুশের রক্ত থেকেই জন্ম নিয়েছিল টিউলিপ ফুল। সেই থেকে লাল টিউলিপ হয়ে উঠেছে নিরপরাধ আত্মত্যাগের প্রাচীন ও চিরন্তন প্রতীক। রাজনৈতিক সহিংসতায় যখনই তরুণ প্রাণ ঝরে যায়, তখন এই পঙ্ক্তিগুলো নিছক ইতিহাসের কোনো ধুলোপড়া নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং জীবন্ত শোকগাথা হয়ে ফিরে আসে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এর রূপের বৈচিত্র্যও চমকে দেওয়ার মতো। কখনো হয়তো শূন্য স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটিমাত্র লাইন। আবার কখনো দেখা যায়, পিয়ানোর বিষণ্ন সুরের সাথে গলা মিলিয়ে তরুণীরা এটি গাইছেন। চোখে পানি, কণ্ঠে কাঁপুনি—বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই গান এতটাই আপন আর তীব্র যে মুহূর্তের মধ্যেই তা হয়ে ওঠে ইন্টারনেটের সবচেয়ে বেশি শেয়ার হওয়া কনটেন্ট। প্রথাগত অর্থে এসব পঙ্ক্তি কোনো পারফরম্যান্স নয়; এগুলো হলো শোকপ্রকাশের তীব্র মাধ্যম। আর অ্যালগরিদম সেই শোককে বদলে দেয় প্রতিবাদের হাতিয়ারে।
নতুন 'নাক্কাল'
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর একটি হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় একদল নতুন ইনফ্লুয়েন্সারের উত্থান। তাদের কনটেন্টের পুরোটাই ক্লাসিক্যাল কবিতার নাটকীয় আবৃত্তি। লাখ লাখ—এমনকি কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ারের এসব অ্যাকাউন্টে আর কিচ্ছু থাকে না। হয়তো কোনো সিনেমাটিক দৃশ্যের নেপথ্যে ভেসে আসে কবিতা পড়ার কণ্ঠ। কিংবা সমসাময়িক পিয়ানোর সুরে গাওয়া হয় কোনো গজল। ঐতিহ্যের প্রতিটি কোণ থেকেই তারা রসদ সংগ্রহ করেন। বিখ্যাত কিংবা অচেনা, ক্লাসিক্যাল বা আধুনিক, আধ্যাত্মিক কিংবা রাজনৈতিক—মানুষের মনে ঝংকার তুলতে পারে এমন যেকোনো কিছুই তারা বেছে নেন।
উদাহরণ হিসেবে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট @asharenabir-Gi-এর (খাঁটি কবিতা) কথাই ধরা যাক। কবিতার পঙ্ক্তির সাথে ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ আর মন-উদাস-করা সুর জুড়ে দিয়ে এই অ্যাকাউন্টটি এর মধ্যেই ১.২ মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার জুটিয়ে ফেলেছে। পাগলের মতো শেয়ার আর রিশেয়ার হতে থাকে এই পোস্টগুলো। ফারসি ভাষার সোশ্যাল মিডিয়ার আনাচে-কানাচে, সর্বত্র এদের ছড়াছড়ি। কেউ যদি বোঝাতে চান যে তিনি প্রেমে পড়েছেন, কিংবা ক্লান্ত, বা শোকে বিহ্বল, অথবা কঠিন কোনো দিনে স্রেফ বেঁচে আছেন—তবে তিনি নিজের মতো করে নতুন কোনো কথা গুছিয়ে লেখেন না। তিনি কেবল এর মধ্য থেকে কোনো একটা পোস্ট শেয়ার করে দেন। সঠিক কবিতার সাথে লাগসই সুর মেলানোর সেই আবেগি পরিশ্রমটুকু ইনফ্লুয়েন্সার আগেই করে রেখেছেন। নেটিজেনদের কাজ শুধু সেই অনুভূতির সাথে নিজেদের এক সুতোয় বেঁধে ফেলা: 'হ্যাঁ, আমি তো ঠিক এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম!'
এই কনটেন্ট ক্রিয়েটররা হলেন আধুনিক ডিজিটাল যুগের 'নাক্কাল'। একসময় ইরানের কফিহাউসগুলোতে যারা 'শাহনামা' আবৃত্তি করতেন, সেই ঐতিহ্যবাহী গল্পকথকদেরই উত্তরসূরি তারা। উনিশ শতকের এক ইউরোপীয় পর্যটক তার বর্ণনায় এক ফারসি কাফেলাচালকের কথা লিখেছিলেন। ওই লোক কেবল স্মৃতি থেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতার একেকটা পর্ব আবৃত্তি করে পুরো দলকে মাতিয়ে রাখতে পারতেন। আজকের দিনে সেই কাফেলাচালকের হাতে উঠে এসেছে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আর রিং লাইট। মাধ্যম বদলেছে ঠিকই, কিন্তু আবেগে ভাটা পড়েনি।
এই বিষয়টিকে সাংস্কৃতিকভাবে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এর উল্টোস্রোত। সাধারণত সাহিত্য সংস্কৃতির যে গতানুগতিক যাত্রাপথ, তাকেই এটি পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। বেশির ভাগ সাহিত্যিক ঐতিহ্যেই দেখা যায়, ধ্রুপদি সাহিত্য সাধারণ মানুষের জানাশোনা থেকে ক্রমশ বিশেষায়িত গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়। হাটবাজার থেকে এর ঠিকানা হয় একাডেমির চার দেয়ালে। কিন্তু ইরানে ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা। এক বা দুই প্রজন্ম ধরে যে কবিতা কেবল সাহিত্যের অধ্যাপক আর বয়স্ক কবিতাপ্রেমীদের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল, তা আজ আবার হুড়মুড় করে ফিরে আসছে দৈনন্দিন জীবনে। আর যেসব প্ল্যাটফর্মের কারণে মানুষের চিন্তার গভীরতা তলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই প্ল্যাটফর্মগুলোই আজ কবিতাকে পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়।
২০২৩ সালে 'ইউরোপিয়ান জার্নাল অব কালচারাল স্টাডিজ'-এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, ইরানের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ৭৬ শতাংশই ইনস্টাগ্রামের দখলে। এই প্ল্যাটফর্মই দৃশ্যশিল্প আর সাহিত্যের মিলনমেলা হয়ে উঠেছে। গবেষকেরা একে বলছেন 'অ্যাক্টিভিস্ট পোয়েটিক কনটেন্ট'। শিল্প, শব্দ আর কবিতার মিশ্রণে এটি হয়ে উঠেছে ডিজিটাল অভিব্যক্তির এক নতুন রূপ।
রক্তে মিশে আছে কবিতা
কিন্তু ইরানেই কেন এমনটা ঘটছে? ইংল্যান্ডে কেন নয়? সেখানেও শেক্সপিয়র তো একই রকম পুরোনো আর জনপ্রিয়। একটু তলিয়ে দেখলেই এর পেছনে জড়িয়ে থাকা কয়েকটি সুতো নজরে আসবে।
প্রথম কারণটি কাঠামোগত। ফারসি ক্লাসিক্যাল কবিতা—গজল, রুবাই বা মসনবি—সব সময়ই মানুষের মুখে মুখে ফেরার জন্য রচিত হয়েছিল। হাফিজের গজল লেখা হয়েছিল আসরে বসে গাওয়ার জন্য। রুমির পঙ্ক্তি ছিল আধ্যাত্মিক উপলব্ধির চরম মুহূর্তে সশব্দে উচ্চারিত স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস। বইয়ের পাতায় ছাপা হওয়ার বহু শতাব্দী আগে থেকেই 'শাহনামা' পাঠ হতো পেশাদার গল্পকথকদের মুখে মুখে। এসব কবিতার জন্মই হয়েছিল শোনার আর শোনানোর জন্য; পড়ার ঘরের নিরিবিলি পরিবেশ বা বইয়ের পাতার ফুটনোট হওয়ার জন্য নয়।
আর সোশ্যাল মিডিয়ার মূল মনোযোগই তো সংক্ষিপ্ত অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের ওপর। অনেক দিক থেকেই এটি ফারসি সাহিত্যচর্চার আদি রীতিতেই ফিরে যাওয়া। ফারসি কাব্যের মূল ভিত্তি হলো দুই লাইনের পঙ্ক্তি, অর্থাৎ দ্বিপদী (কাপলেট)। ইনস্টাগ্রাম স্টোরি, রিল বা ক্যাপশনের জন্য একদম নিখুঁত আকার। শেয়ার করার জন্য এই ধরনটি আগে থেকেই পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। দরকার ছিল শুধু একটা নতুন মাধ্যমের।
দ্বিতীয় কারণ আবেগের নিখুঁত প্রকাশ। হাজার বছর ধরে ফারসি কবিতা মানুষের মনের গভীর অবস্থা ভাব প্রকাশের জন্য অসাধারণ সূক্ষ্ম শব্দভান্ডার গড়ে তুলেছে। প্রেম, বিরহ, আকুলতা, আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা, রাজনৈতিক ক্ষোভ কিংবা অস্তিত্বের সংকট—সবকিছুর জন্যই আছে উপযুক্ত শব্দ। কোনো তরুণ ইরানি যখন এমন কোনো পঙ্ক্তির দেখা পান, যা তার ভেতরের অনুভূতিকে হুবহু ফুটিয়ে তোলে, তখন তিনি নিছক সাহিত্যের প্রশংসায় মেতে ওঠে না। তার মধ্যে ঘটে এক আত্ম-আবিষ্কার। কবিতাটি তখন আর শুধু তার অনুভূতির বর্ণনা দেয় না; বরং সেটাই হয়ে ওঠে তার জীবন্ত অনুভূতি। এমন এক নিখুঁত ভাষায় তা প্রকাশ পায়, যা তিনি নিজে হয়তো কখনোই বলে বোঝাতে পারতেন না।
তৃতীয় কারণটি হলো আত্মপরিচয়। এমন এক দেশ, যেখানে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিনিয়ত বিতর্কের মুখে, সেখানে ক্লাসিক্যাল কবিতাই 'আন্ডারগ্রাউন্ড' জাতীয় ভাষার কাজ করছে। এটি এমন এক ভাষা, যা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়েও প্রাচীন। 'শাহনামা' পাঠ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ঘরে ঘরে। শিশুরা এখন স্টেজে এর পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করছে। হাফিজের গজল, রুমির আধ্যাত্মিক কবিতা আর ফেরদৌসীর মহাকাব্যের ওপর নেওয়া ক্লাসের চাহিদা এখন তুঙ্গে। এই চাহিদার পেছনে কোনো একাডেমিক বাধ্যবাধকতা নেই, বরং আছে শেকড় খোঁজার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
কবিতা ও প্রতিরোধের এই যে নিবিড় মেলবন্ধন, পৃথিবীর অন্যান্য ঐতিহ্য খুঁজলেও এর সমান্তরাল অনেক দৃষ্টান্ত চোখে পড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার কবি ডেনিস ব্রুটাসের কথাই ধরা যাক। নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে তাকেও রোবেন দ্বীপে কারাবন্দী করা হয়েছিল। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তার কবিতাই হয়ে উঠেছিল প্রধান অস্ত্র। ২০০৬ সালে প্রকাশিত 'পোয়েট্রি অ্যান্ড প্রোটেস্ট' বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে তার পঙ্ক্তিগুলো সেই আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশের 'আইডেন্টিটি কার্ড' কবিতাটি গোটা আরববিশ্বেই প্রতিবাদের গান হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৮১৯ সালের 'টারলু পর পি বি শেলি লিখেছিলেন 'দ্য মাস্ক অব অ্যানার্কি'। ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ছাত্র-বিক্ষোভ থেকে শুরু করে ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যের পোল ট্যাক্স দাঙ্গার সময়ও শেলির সেই কবিতার লাইনগুলো স্লোগান হিসেবে আবৃত্তি করেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
কিন্তু ফারসি কবিতার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। এ কবিতার বিশালত্ব আর ব্যাপ্তিই একে অন্যান্য দৃষ্টান্ত থেকে আলাদা করে তুলেছে, অ্যাক্টিভিস্টদের মুখে মুখে ফেরা গুটিকয় কবিতা নয়। কয়েক শতাব্দী আর হাজারো কবির হাত ধরে গড়ে ওঠা সাহিত্যিক ঐতিহ্য আজ লাখো মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক ভাষার জীবন্ত শব্দভান্ডার হিসেবে কাজ করছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, যেসব তরুণ-তরুণী এই পঙ্ক্তিগুলো শেয়ার করছেন, তাদের অনেকেই জানেন না এগুলো কার লেখা। তারা জানেন না যে সেইফ-ই ফারগানি মোঙ্গল আগ্রাসন যুগের মানুষ। কিংবা আরেফ কাজভিনি তার তাসনিফ রচনা করেছিলেন সাংবিধানিক বিপ্লবের শহিদদের জন্য। তারা এ-ও জানেন না যে, নারীর আকাক্সক্ষা নিয়ে লিখে সমাজে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন ফরুগ ফারোখজাদ। তারা শুধু জানেন, এই শব্দগুলো সত্যি। তারা যা অনুভব করেন, তার সাথে এই শব্দগুলো অবিকল মিলে যায়। তারা চারপাশে যা দেখছেন, তার প্রতিচ্ছবি এই শব্দগুলো। তারা যা বলতে চান কিন্তু বলতে পারেন না, এই শব্দগুলো ঠিক তা-ই। ইরানিরা যেভাবে কবিতার প্রতি এই ভালোবাসা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন—অনেকে যেমনটা বলে, 'রক্তে মিশে আছে'—তাতে এই পুরো ব্যাপারটাকে কোনো সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ মনে হয় না, মনে হয় যেন শেকড়ে ফেরা। শতাব্দীপ্রাচীন অতীত থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ, বলখ থেকে ইস্পাহান হয়ে তেহরান—ইতিহাসের পুরোনো খোলস ছেড়ে এই কবিতাগুলো ঢুকে পড়েছে এক চিরস্থায়ী আবেগময় বর্তমানে।
আর এটাই হয়তো মহান কবিতার শক্তির চূড়ান্ত প্রমাণ। কবিতা তার সৃষ্টির প্রেক্ষাপটকে ছাপিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকে। সে ঝেড়ে ফেলে তার ফুটনোট। নতুন শতাব্দীতে, নতুন কোনো মাধ্যমে, একেবারে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকটের মাঝে হাজির হয় সে। আর কী অদ্ভুতভাবে খাপ খাইয়ে নেয়! মনে হয়, যেন আজ সকালেই কেউ একজন লিখেছে এটা—এমন কেউ, যে ঠিকঠাক জানে আপনি এই মুহূর্তে ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একটা ফাঁকা স্ক্রিন। ক্যালিগ্রাফিতে আঁকা এক লাইন লেখা। প্রাচীন সেই পঙ্ক্তি। আর 'শেয়ার' বাটনে ট্যাপ করা একটা আঙুল। এই বিশাল ডিজিটাল দুনিয়ার কোথাও না কোথাও বসে কোনো এক অচেনা মানুষ ঠিক একই শব্দগুলো পড়ছে আর ভাবছে: 'হ্যাঁ, এটাই তো, ঠিক এটাই!' অথচ এই ডিজিটাল দুনিয়ার কথা শুনলে সাদি, রুমি বা ফারোখজাদ—সবাই হয়তো সমানভাবে খাবি খেতেন।
ইরানে অ্যালগরিদম কবিতাকে মেরে ফেলেনি। বরং তাকে দিয়েছে নতুন কণ্ঠস্বর।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে, মিনা রামিনসাবেত
