এনবিআরের সরেজমিন পরিদর্শন অভিযানের ঘোষণায় হয়রানি ও দুর্নীতি বাড়ার আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের
কর ফাঁকি শনাক্তে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন চালিয়ে প্রয়োজনীয় নথি ও ইলেকট্রনিক তথ্য জব্দ করার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, এ উদ্যোগ রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও দুর্নীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী নেতারা করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে একদিকে কর ফাঁকি কমবে, অন্যদিকে কর কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে।
এনবিআরের ঘোষণার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) নিয়ম মেনে চলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
গত ১৯ জুলাই জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানায়, উৎসে কর (টিডিএস) যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য এনবিআরের কর্মকর্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম-সংক্রান্ত যেকোনো নথিপত্র পরীক্ষা ও তলব করতে পারবেন। একই সঙ্গে কম্পিউটার সিস্টেম, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্যও পরীক্ষা করতে পারবেন। প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্যে প্রবেশের ক্ষমতাও থাকবে তাদের।
উৎসে কর কর্তনের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করে নিজস্ব হেফাজতে রাখা এবং প্রয়োজনীয় নথি, ছবি বা অ্যাকাউন্টের অনুলিপি সংগ্রহের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের পরিদর্শনে কেউ বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ওই ধারায় বাধা, প্রতিবন্ধকতা বা অসহযোগিতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ক্ষমতা বিদ্যমান আইনেই রয়েছে। তবে অতীতে এ ধরনের কার্যক্রম শুরুর আগে সাধারণত প্রকাশ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হতো না; বরং নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে পরিদর্শন পরিচালিত হতো। এবার আগাম ঘোষণা দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ টিবিএসকে বলেন, "রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এনবিআর এ ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে কর্মকর্তাদের ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ আরও বাড়বে।"
তিনি বলেন, "কর্মকর্তারা যদি কম্পিউটার ও হিসাবের খাতা জব্দ করেন, তাহলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হবে। এতে রাজস্ব বাড়ার পরিবর্তে ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।"
রাজস্ব আদায় বাড়াতে করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের একজন শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক টিবিএসকে বলেন, "এর ফলে নিয়ম মেনে চলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও হয়রানির শিকার হবে। একই সঙ্গে ঘুষের প্রবণতাও বাড়তে পারে।"
এনবিআরের ঘোষণার পরদিন দেওয়া এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
সংগঠনটি বলেছে, আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর পরিপালনে ইতোমধ্যে অনুগত (কমপ্লায়েন্ট) ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেন কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি কর-অনুগত হতে পারেনি, তাদের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ দিয়ে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডিসিসিআই।
এ বিষয়ে জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কিছু বলা হয়নি। আইনে যে ক্ষমতা রয়েছে, সেটিই মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গেলে কর্মকর্তারা অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন।"
তিনি আরও বলেন, "এবার আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অনেক বড়। আয়করের সবচেয়ে বড় অংশ আসে ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স (টিডিএস) থেকে। এ খাতে যেন কোনো ফাঁকি না হয়, সে জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।"
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আহরণ জোরদারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ ধরনের মাঠপর্যায়ের অভিযান অনেকটাই কমে যায়। বরং কয়েকটি ঘটনায় অভিযানে গিয়ে কর্মকর্তারা হামলার শিকারও হন। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এ ঘোষণা সেই উদ্যোগেরই অংশ।
