১০ বছরের পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে মিনাবের স্কুলে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী, সতর্কবার্তা এড়িয়ে যান কমান্ডাররা
যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডাররা গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডারে থাকা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলেন। সে সতর্কবার্তায় ইরানে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য মারাত্মকভাবে পুরোনো হয়ে গেছে তার উল্লেখ ছিল। এরপর তারা কয়েকটি হামলার অনুমোদন দেন, যার মধ্যে একটি হামলা একটি বিদ্যালয়ে আঘাত হানে এবং এতে প্রায় ২০০ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত তিন সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত একটি ব্যবস্থায় এমন বার্তা সংযুক্ত ছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্য বহু বছর আগের এবং তা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো স্থাপনাকে হামলার তালিকায় যুক্ত করতে হলে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনও বাধ্যতামূলক ছিল।
দুইটি সূত্র জানায়, যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু সরবরাহ করার তাড়নায় 'দ্রুততার স্বার্থে' ঊর্ধ্বতন কমান্ডাররা ওই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সূত্রগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্তই সরাসরি বিদ্যালয়টিতে ভুলবশত হামলার জন্য দায়ী।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন। এই সংখ্যা সঠিক হলে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এটি বেসামরিক হতাহতের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হবে। হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।
একটি সূত্র জানায়, 'বিদ্যালয়টিতে হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বুঝে গিয়েছিলেন কীভাবে এই ভুলটি হয়েছিল। এটি যে স্পষ্টতই পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে হয়েছিল, তা তখনই জানা গিয়েছিল।'
কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পেন্টাগন এখনো এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'এই তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আগেও বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।'
পুরোনো তথ্য শেষ পর্যন্ত কেন ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আগে প্রকাশ না পাওয়া এসব তথ্য যুদ্ধের আগে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে তাড়াহুড়োতে কীভাবে একটি বিদ্যালয়ে ভুলবশত হামলার কারণ হয়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে নতুন আলোকপাত করেছে।
পেন্টাগন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে করা প্রশ্নগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের কাছে পাঠায়। তবে চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য একটি সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অনেকটাই কমে এসেছে, তবুও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বড় পরিসরে পুনরায় বোমা হামলা শুরুর হুমকি দিয়ে আসছেন।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ মিনাবে অবস্থিত 'শাজারেহ তাইয়িবা' বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি ঘটে। সিএনএনের হাতে থাকা প্রাথমিক সামরিক তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
২০১৩ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘাঁটিটি একসময় একই কমপ্লেক্সের অংশ ছিল।
কিন্তু ২০১৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বিদ্যালয়টিকে ঘাঁটির বাকি অংশ থেকে আলাদা করতে একটি বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা একটি প্রবেশপথও তৈরি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে বিদ্যালয়ের মাঠে কয়েক ডজন মানুষকে খেলাধুলা করতে দেখা যায়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই এই হামলা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হাজারো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদ করতে সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা তখন তড়িঘড়ি কাজ করছিলেন।
সূত্রগুলোর মতে, হামলা শুরুর আগেই পেন্টাগনের তথ্যভাণ্ডারে থাকা সব প্রাসঙ্গিক তথ্য তারা হালনাগাদ করতে পারেননি।
ফলে হামলার তালিকায় যুক্ত হওয়া অনেক লক্ষ্যবস্তুর গোয়েন্দা তথ্য ১০ বছরেরও বেশি পুরোনো ছিল। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের পাশের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্থাপনাটির তথ্যও ছিল।
দুইটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা প্রথমে যেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ছিল, সেগুলোর তথ্যই অগ্রাধিকার দিয়ে হালনাগাদ করেন।
সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই 'উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত' লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল চলমান বা স্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম লক্ষ্যবস্তু এবং যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে বিবেচিত হতো।
প্রথম সূত্রটি জানায়, 'আমরা যেসব লক্ষ্যবস্তুকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এবং অভিযানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করেছিলাম, যেমন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও যুদ্ধবিমান, সেগুলোর তথ্য দ্রুত পুনরায় যাচাই করা হচ্ছিল।'
দ্বিতীয় সূত্রটি জানায়, বিদ্যালয়ে পরিণত হওয়া লক্ষ্যবস্তুর মতো স্থায়ী স্থাপনাগুলোকে তুলনামূলক কম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, কারণ সেগুলোর স্থান পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্লেষকেরা এসব স্থাপনার অনেক তথ্যই হালনাগাদ করতে পারেননি।
দুইটি সূত্র জানায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত 'আধুনিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার' এবং 'যন্ত্র-সহায়তাপ্রাপ্ত দ্রুত বিশ্লেষণভান্ডার'—এই দুই তথ্যভাণ্ডারেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ইরানের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত তথ্য ব্যবহার করার আগে অবশ্যই তা হালনাগাদ করতে হবে।
'আধুনিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার' হলো পেন্টাগনের পুরোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থা, যা ১৯৮০-এর দশকে তৈরি করা হয়েছিল। এটি মূলত বিশ্লেষকদের হাতে তথ্য সংযোজনের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়।
'যন্ত্রের সহায়তাপ্রাপ্ত দ্রুত বিশ্লেষণ ভাণ্ডার' হলো পেন্টাগনের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা এ বছর কার্যকরভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দুটি ব্যবস্থাই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে। সম্প্রতি সংশোধিত পেন্টাগনের নির্দেশিকা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, এখনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক তথ্যের প্রধান ভিত্তি পুরোনো তথ্যভাণ্ডারটিই।
একজন বিশ্লেষক আলাদা একটি ডিজিটাল গোয়েন্দা ব্যবস্থায় আগে থেকেই ওই স্থাপনার পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তবে প্রথম সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না।
ফলে সেই তথ্য কখনোই সামরিক কমান্ডারদের কাছে পৌঁছায়নি।
একই সূত্র জানায়, ওই বিশ্লেষকের সতর্কবার্তা এবং পেন্টাগনের গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডারের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো কীভাবে বিদ্যালয়ে ভুলবশত হামলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল, চলমান তদন্তে সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এই ঘটনার জন্য হয়তো ইরান দায়ী হতে পারে। পরে তিনি বলেন, প্রকৃত দায় কার, তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই হামলার বিষয়ে 'পূর্ণাঙ্গভাবে' তদন্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক হতাহত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র 'সম্ভব সব ধরনের চেষ্টা' করেছে।
একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানায়, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্ব সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর দ্রুত লক্ষ্যবস্তু সরবরাহের জন্য চাপ সৃষ্টি করছিল।
এই চাপ কয়েক সপ্তাহব্যাপী সংঘাতজুড়েই অব্যাহত ছিল এবং এতে হামলার উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় কমান্ড ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
একটি সূত্র সিএনএনকে বলে, 'পেন্টাগন সবাইকে আরও দ্রুত কাজ করতে চাপ দিচ্ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'এখানে অনেক সাবেক হেজ তহবিল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং টেলিভিশনে পরিচিত মুখ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নেতৃত্বও এ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি।'
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত দুইটি সূত্র জানায়, ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ার আরেকটি কারণ ছিল—প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকেই বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানো কর্মসূচির জনবল কমিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ অন্যান্য যুদ্ধ পরিচালনাকারী কমান্ডে এই দলগুলো আগে থেকেই জনবল সংকটে ছিল।
বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে হেগসেথের আনা পরিবর্তন সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাইলেও প্রতিরক্ষা সচিবের দপ্তর কোনো জবাব দেয়নি।
হেগসেথ বারবার বলেছেন, তিনি মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের ওপর থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধ কমিয়ে তাদের আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে চান।
এই নীতিকে তিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন এভাবে—'সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী সক্ষমতা, দুর্বল আইনগত সীমাবদ্ধতা নয়।'
ইরান যুদ্ধের আগে হেগসেথ বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও প্রতিক্রিয়া জানানো কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করেন এবং সামরিক কমান্ডগুলোতে এ কর্মসূচির জনবল ৯০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেন।
এর মধ্যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী হামলা-পরিকল্পনা দল থেকে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি–বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় কমান্ডে ১০ সদস্যের দলকে কমিয়ে মাত্র একজন পূর্ণকালীন কর্মীতে সীমিত করা হয় বলে সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে।
একটি সূত্রের ভাষ্য, 'আমি জানি কেন্দ্রীয় কমান্ডের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দলটি তখনও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেগসেথের সিদ্ধান্তের কারণে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ ছিল না।'
