শিবির নেতাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্যে সংসদে হট্টগোল
বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের এক নিখোঁজ নেতাকে উদ্ধার এবং পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে আজ রোববার (১৪ জুন) সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক বাগ্বিতণ্ডা, হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের খবর জানান। এরপর তিনি ছাত্রশিবির থেকে সদ্য বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক মোহাম্মদ জিসান মিয়া প্রধানের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী পুলিশি অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১১ জুন কুমিল্লা থেকে জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে রাসেল আহমেদ নামে একজন দাউদকান্দি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তবে পুলিশি অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে এক নারীর সঙ্গে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের ফলে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাঁকে জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার ওষুধ খাওয়ান।
মন্ত্রী সংসদে আরও বলেন, গত ১২ জুন বিয়ের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও ১১ জুন রাতে বিয়ের পিঁড়িতে না বসার উদ্দেশ্যে জিসান নিজেই আত্মগোপন করেন। পরে পুলিশ তাঁকে লাকসাম এলাকা থেকে উদ্ধার করে। বর্তমানে ভিকটিম নারী বাদী হয়ে জিসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন এবং ইতিমধ্যে দুজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, জিসানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেকেই ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সরকারকে দায়ী করতে চেয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা দরকার মনে করেই তিনি বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই ফ্লোর নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াত নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাহের। তিনি বলেন, ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার পর সম্পূরক প্রশ্ন করার নিয়ম না থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সুযোগ নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিয়েছেন।
আবদুল্লাহ তাহের আরও বলেন, "একটি অনিষ্পত্তিকৃত ও বিতর্কিত বিষয়কে পার্লামেন্টে এভাবে আনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। মনে হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি দলকে হেয় করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে (ইনটেনশনালি) এটি করেছেন।" তিনি প্রশ্ন তোলেন, জিসান এখন কোথায় আছে? কুমিল্লার পুলিশ জিসান বা ভিকটিমের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দিচ্ছে না কেন? এখানে কোনো ষড়যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে কি না—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সদস্যরা চিৎকার শুরু করলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোল শুরু হয়। এতে সংসদ কক্ষে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং অধিবেশনের কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বারবার সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ৩০০ বিধিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কোনো প্রশ্ন বা বিতর্কের সুযোগ নেই। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা যেহেতু দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে বিশেষ বিবেচনায় সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে বা অসংসদীয় কোনো ভাষা যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে থেকে থাকে, তবে সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তীতে এক্সপাঞ্জ (সংসদীয় রেকর্ড থেকে বাদ) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্পিকারের কঠোর অবস্থান ও রুলিংয়ের পর সংসদ কক্ষ শান্ত হয়। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলের উপনেতাসহ সকল সদস্য আসনে ফিরে গেলে স্পিকার পরবর্তী কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু করার ঘোষণা দেন।
