সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, 'বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে দেশের সব খাতের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদেরকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
আজ বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এসময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১১ জুন এই সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপিত হবে। এতে আমরা চেষ্টা করেছি ব্যবসায়ীদের (বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী হতে পারেন, ট্রেডারও হতে পারেন অথবা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হতে পারেন) জন্য এমন সুবিধা তৈরি করতে, যাতে তারা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে পারেন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চেষ্টা করছি এবারের বাজেটটি সেভাবেই তৈরি করতে। তারই অংশ হিসেবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'স্বৈরাচার সরকারের সময়ে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশকে গড়ে তুলতে হলে অর্থনৈতিক সুশৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন ফিরিয়ে আনতে হবে এবং একইসঙ্গে দেশে ব্যবসাবান্ধব একটি পরিস্থিতি বা পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।'
তিনি বলেন, 'বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন করা, আমদানি ও রপ্তানি নীতি হালনাগাদ করা, রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করার পদক্ষেপ, বন্ডেড এবং নন-বন্ডেড সব প্রতিষ্ঠানকে এফওসি ভিত্তিতে আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।'
তারেক রহমান বলেন, 'আমদানি সহজীকরণের লক্ষ্যে মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি সহজ করা হচ্ছে এবং সব আমদানিকারকের জন্য মূল্যসীমা নির্বিশেষ এলসি ব্যতীত চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি বাস্তবায়ন ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাণিজ্য সহজীকরণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কমানো এবং সেবার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'একইসঙ্গে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত ও নীতিগত সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলধন ও বিনিয়োগ প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। এছাড়া লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।'
তারেক রহমান বলেন, 'সেইসঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে লজিস্টিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর লক্ষ্যে নতুন বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান সুবিধার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'চলতি বছর কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে লালদিয়া টার্মিনাল প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ অগ্রসর হচ্ছে, যা সম্পন্ন হলে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করতে পারবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।'
এছাড়া জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম সাবিকুন্ নাহার এক সম্পূরক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান- 'বর্তমানে অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। দেশে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হার নীতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে মার্চের শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ অলস তহবিল বেড়েছে ৫৮.৩ শতাংশ। গত বছরের মার্চে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলেছেন যে উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ শতাংশ দাড়িয়েছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তে পিছিয়ে যাচ্ছেন, এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। এ অবস্থা নিরসনে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?'
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ব্যবসা বা বিজনেস বা ইকোনমি এমন একটি বিষয়, যার নীতির ফলাফল সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যায় না। সেটি ভালো বা খারাপ যে ধরনের পলিসিই হোক। স্বৈরাচারের খারাপ পলিসির স্পিল ওভার ইফেক্ট যেরকম আস্তে আস্তে আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে, ঠিক একইভাবে এই জিনিসগুলোকে সংশোধন করতে বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, তার স্পিল ওভার ইফেক্ট বা একটা পজিটিভ রেজাল্ট পেতেও কিছু সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।'
এসময় তিনি বলেন, 'ব্যবসা বিনিয়োগে গতি আনতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে এর স্পিল ওভার ইফেক্ট বা পজিটিভ রেজাল্ট পেতে অপেক্ষা করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'সবসময় সুদের হার কমালেই যে বেনিফিট পাওয়া যাবে তা নয়। সরকার এই বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করছে। যদি ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় যে সুদের হার কমালে ব্যবসায়ীরা, দেশের অর্থনীতি বেনিফিট পাবে; তাহলে নিশ্চয়ই আমরা সেটি করব।'
এসময় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নকর্তা সংসদ সদস্যের উদ্দেশে বলেন, 'আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যাটিক্সগুলো যেভাবে পড়লেন, তাতে বোঝা গেলো আপনি রিসার্চ করে এসেছেন । আপনি আরেকটি তথ্য উল্লেখ করতেন তাহলে বোধহয় ভালো হতো। নিশ্চয়ই পত্রিকায় দেখেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড তৈরি করেছে। বিভিন্ন শিল্প; যারা বিভিন্নভাবে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, যাদের ক্রেডিবিলিটি আছে, যারা সত্যিকারভাবে ব্যবসায়ী মাত্র ৯% সুদে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে। এটি কেন আপনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল বুঝলাম না। কারণ এটি তো বর্তমান সরকারের উদ্যোগ।'
তিনি বলেন, 'আপনি এর আগের এক বছরের কথা বলেছেন, বর্তমানটি এড়িয়ে গেলেন কেন, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আপনাকে অনুরোধ করব আগামীতে আরও আপডেট ইনফরমেশন নিয়ে আলোচনা করতে।'
আরেকজন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম জহরত আবির আদিব চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশি ইনভেস্টমেন্ট দেশে নিয়ে আসতে পারলে আমরা তাদেরকে সেই বিনিয়োগের ১.৫% ইনসেন্টিভ দেব। ফলে আমরা আশা করছি বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হবে। এফডিআই আকৃষ্ট করা যাবে।'
তিনি বলেন, '৩/৪ দিন আগে মিটিং করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন সহজ করা হয়েছে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি বিষয় ছিল যে সে যদি তার লভ্যাংশ নিতে না পারে, তাহলে কেন সে ইনভেস্ট করবে। এই সমস্যাটা আমরা আইনের মাধ্যমে সমাধান করেছি।'
