প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর: চীনের অর্থায়ন ও বড় বিনিয়োগে নজর ঢাকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট, অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহ ও দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে বেইজিংয়ে আগামী ২৪ জুন বিনিয়োগ বিষয়ক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এই সম্মেলনে তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার জন্য কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জ ইকোনমিক জোনে চীনা কোম্পানি হান্ডা গ্রুপের জন্য জমি বরাদ্দ চুক্তি এবং চট্টগ্রামে চীনা ইকোনমিক জোনে চীনা ডেভেলপার নিয়োগ বিষয়ক চুক্তি।
একইসঙ্গে স্থবির হয়ে পড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে তিস্তা ব্যারেজ, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এদিকে মোংলা বন্দরের কাছে আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আরও আগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) থেকে বড় অংকের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেবে ঢাকা।
সরকারের বিদ্যমান প্রকল্প তালিকা অনুযায়ী, চীন সরকারের আর্থিক সহায়তা, এআইআইবি ও এনডিবি থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ প্রস্তাব রয়েছে। এর বাইরে চীনের অর্থায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কোন কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, তার তালিকা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। তালিকাগুলো পাওয়ার পর তা সমন্বয় করে নতুন প্রস্তবনা তৈরি করা হবে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ-চায়না ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নেগোসিয়েশন শুরুর বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। চায়না-বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট এগ্রিমেন্ট দ্রুত আপগ্রেড করার বিষয়েও আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি, দুই দেশের মধ্যে ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা সংক্রান্ত এমওইউ স্বাক্ষর করা ও ভাইস ভার্সা ভিত্তিতে চীনের ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
এছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ট্রেড, গ্রিন ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল ইকোনমি, কৃষি, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন, ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে পারস্পারিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকারখাত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নেওয়া সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি-সহায়তা চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরবে বাংলাদেশ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে চট্টগ্রামে চীন ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার জানান দিতে ডেভেলপার নিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষর করতে গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে সরকার।
চীনে বাণিজ্যের প্রসার
চীনের কুনমিংয়ে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি এক্সপোতে যোগ দিতে আজ বৃহস্পতিবার বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ৫ দিনের জন্য বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরাও থাকছেন মন্ত্রীর প্রতিনিধিদলে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কুনমিং এক্সপোতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য চীনা ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করা ও চীনের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধিই সরকারের মূল লক্ষ্য।
কুনমিং এক্সপোতে যোগ দিতে চীন যাচ্ছেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট মো. খোরশেদ আলম।
টিবিএসকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট রয়েছে, তাই তাদের চেষ্টা থাকবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা দেশের বন্ধ বা সংকটে থাকা কারখানাগুলোতে চীনা বিনিয়োগ এনে যৌথ উদ্যোগে সেগুলো চালু করা। এজন্য চীনা ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করবেন তারা।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশকিছু সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর হয়েছিল।
শেখ হাসিনার সফরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সাপোর্ট পাওয়ার আশা ছিল বাংলাদেশের। তবে ১ বিলিয়ন উইয়ান অনুদান দিয়েছিল চীন, যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা ১৩৬ মিলিয়ন ডলার।
হান্ডা গ্রুপের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনে চীন থেকে হান্ডা গ্রুপের প্রতিনিধিসহ ব্যবসায়ীদের বড় একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছিল। তাদের চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। ওই সময়ে হান্ডা গ্রুপ বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে ১৫০ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
গত বছরের জুলাইয়ে মীরসরাইতে বেপজা ইকোনমিক জোনে ৪১.৩৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে চীনা অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানিটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্মেলনে হান্ডা গ্রুপের বিনিয়োগের জন্য ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ ইকোনমিক জোনে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিডা। এছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা ইকোনমিক জোনে চীনা ডেভেলপার নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও চুক্তি স্বাক্ষর করা হতে পারে।
৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়নের প্রস্তাব
ইআরডির কর্মকর্তারা বলেছেন, চীন সরকারের অর্থায়নে অপেক্ষায় থাকা প্রকল্প রয়েছে ৯টি। এসব প্রকল্পে ঋণ প্রস্তাব রয়েছে ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হলো- তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন।
এআইআইবি অর্থায়নের অপেক্ষায় রয়েছে ১৭ প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৯০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রতিটি ২,৫০০-৩,০০০ টিইউই ধারণক্ষমতা সম্পন্ন (ছয়টি) নতুন সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ ক্রয়, বিআরইবি নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি (চট্টগ্রা-সিলেট বিভাগ) ও বিআরইবি নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি (রাজশাহী-রংপুর বিভাগ) (৩৫০মি)।
৯০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা প্রস্তাবটির মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হবে ক্লাইমেট রিজিলেন্ট এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিন এনার্জি প্রগামের জন্য এবং ৪০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হবে ওয়াটার রিজিলেন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট-স্মার্ট আরবান ডেলিভারি প্রগামের জন্য।
এনডিবির অর্থায়নের তালিকায় রয়েছে ৭ প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ১.২বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ, তিতাস গ্যাসের প্রাকৃতিক গ্যাস নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা ও সরবরাহ দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ গ্যাস নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।
