কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শিগগিরই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে?
এ বছর শেষের দিকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কোম্পানি অ্যানথ্রপিক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে, তখন সেটি ইতিহাসের অন্যতম বড় আইপিও হতে পারে। এর কারণ, কোম্পানিটির ক্লড চ্যাটবট প্রোগ্রামারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়, আর তারা এটির ব্যবহার করতে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্লড কোড নামে সফটওয়্যার-ইঞ্জিনিয়ারিং এজেন্ট চালুর পর থেকে এটি বিশ্বের বহু সফটওয়্যার ডেভেলপারের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এমনকি অ্যানথ্রপিকের নিজেদের ক্ষেত্রেও। কোম্পানির দাবি, মে মাসে তারা যে কোড প্রকাশ করেছে তার ৮০ শতাংশেরও বেশি লিখেছে ক্লড। অথচ ক্লড কোড চালুর আগে এ হার ছিল 'এক অঙ্কের ঘরে'।
এই প্রযুক্তিগুলো কেবল সংখ্যার দিকেই নয়, বরং কাজের গুণগত মানের দিক থেকেও উন্নত হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমইটিআর-এর এক সূচকে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে অ্যানথ্রোপিকের যে মডেলগুলো কোনো কাজ করতে মানুষের চেয়ে এক ঘণ্টারও কম সময় নিত, তাদের সবশেষ সংস্করণটি এখন মানুষের পুরো এক কর্মদিবসের চেয়েও বেশি সময়ের কাজ অনায়াসে সম্পন্ন করতে পারছে।
বর্তমান প্রজন্মের এআই মডেলগুলো কোডিং ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে, অনেকে আশঙ্কা করছেন—মানুষের তৈরি সবশেষ এআই মডেল হয়তো এগুলোই। অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক মনে করেন, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে একটি এআই সিস্টেম মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের চেয়েও উন্নত উত্তরসূরি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এটি মূলত 'রিকোর্সিভ সেলফ-ইম্প্রুভমেন্ট' (আরএসআই) নামক একটি চক্রের সূচনা করবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি মডেলের প্রথম সংস্করণ তৈরি করবে দ্বিতীয় সংস্করণকে—যা হবে আগের চেয়ে দ্রুত ও দক্ষ। আবার দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরি করবে তৃতীয় সংস্করণকে। এই চক্র চলতেই থাকবে এবং প্রতিবারই এআই-এর কার্যকারিতা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে। একবার এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হলে মানুষের আর কখনোই নতুন কোনো মডেল বা কোড লেখার প্রয়োজন পড়বে না।
জ্যাক ক্লার্কের ভাষায়, 'অনেকের কাছে যা কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে, তা হয়তো বাস্তবে পরিণত হচ্ছে।'
তবে আরএসআইয়ের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না।
এআই মানুষের মতো ক্লান্ত হয় না, বিরতি নেয় না। ফলে অনেকের ধারণা, এটি দ্রুতই 'সুপারইন্টেলিজেন্ট' বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছে যেতে পারে।
এআই নিয়ে হতাশাবাদীরা আশঙ্কা করেন, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং এই চক্রের সূচনাই হবে মানব সভ্যতার চাবিকাঠি যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়ার দিন।
তবে অন্তত শুরুতে এমন স্বয়ং-উন্নয়নশীল এআই কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হবে বলেই ধারণা করা হয়।
এই স্ব-উন্নয়নশীল মডেল তৈরির জন্য বর্তমানে মানুষের করা বেশ কিছু বিশেষায়িত কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। এখন ডেটা বিজ্ঞানীরা এআই-এর তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন এবং কোডাররা তা বাস্তবে রূপ দেন। সিস্টেম ইঞ্জিনিয়াররা এর মূল ভিত্তি তৈরি করেন। অন্য দলগুলো প্রশিক্ষণের জন্য নতুন ডেটা খোঁজে এবং সেফটি বা অ্যালাইনমেন্ট দলগুলো নিশ্চিত করে যে এই মডেলগুলো কোনো ক্ষতি করবে না।
গুগল ডিপমাইন্ডের একটি মডেল 'আলফা ইভলভ' গত মে মাসে নিজেই নতুন অ্যালগরিদম ডিজাইন করা শুরু করেছে। এটি গুগলের ডেটা সেন্টারগুলোর কাজের চাপ কমানোর জন্য এমন একটি পরিবর্তন প্রস্তাব করেছিল যা কোম্পানির বিশ্বব্যাপী কম্পিউটিং ক্ষমতার ০.৭ শতাংশ সাশ্রয় করেছে এবং তাদের প্রধান মডেল 'জেমিনি'র প্রশিক্ষণ গতি ১ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ আরএসআইয়ের জন্য এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্বয়ংক্রিয় হতে হবে। তবে তার আগেই গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব অনুভূত হতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজি (সিএসইটি)-এর জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই দ্বারা সম্পাদিত গবেষণার পরিমাণ যত বাড়বে, মানবনির্ভর গবেষণার তুলনায় উৎপাদনশীলতা দশ গুণ, একশ গুণ এমনকি হাজার গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, গবেষণার কিছু ধাপ শুরুতে স্বয়ংক্রিয় করা কঠিন হলেও দ্রুতগতির অগ্রগতির কারণে সেসব বাধাও দ্রুত অতিক্রম করা হতে পারে।
এআই ইতোমধ্যেই ছোট মডেল তৈরি করতে পারে
আজ কোনো এআইই নিজের পূর্ণাঙ্গ উত্তরসূরি তৈরি করতে পারে না। তবে বড় এআই মডেলগুলো ইতোমধ্যে নিজেরাই ছোট মডেল তৈরি করতে পারে। আর মানুষের সহযোগিতায় তারা বড় মডেল তৈরিতেও অংশ নিতে পারে।
এ বছরের শুরুতে গবেষক আন্দ্রেই কারপাথি—যিনি বর্তমানে অ্যানথ্রপিকে কাজ করেন—জিপিটি-২-এর সমমানের একটি চ্যাটবট তৈরি করেন।
২০১৯ সালে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-২ তৈরি করতে ৩২টি অত্যাধুনিক চিপে ১৬৮ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ লাগত। কারপাথি একই কাজ মাত্র আটটি জিপিইউ-সমৃদ্ধ একটি কম্পিউটারে তিন ঘণ্টায় সম্পন্ন করেন। পরে আরও কয়েক মাস কাজ করে তিনি সময় নামিয়ে আনেন দুই ঘণ্টার সামান্য বেশি।
মার্চে তিনি প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার দায়িত্ব দেন 'অটোরিসার্চ' নামে একটি এআই এজেন্টকে।
মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রশিক্ষণের সময় কমে দাঁড়ায় ১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিটে। আরও পাঁচ দিন পর তা নেমে আসে ১ ঘণ্টা ৩৯ মিনিটে।
কারপাথির ভাষায়, 'আমি কিছুই স্পর্শ করিনি।'
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ১৮ শতাংশ উন্নতি এমন একজন মানুষের কাজের ওপর অর্জিত হয়েছে, যিনি ওপেনএআইয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন গবেষণা দলের সদস্য ছিলেন এবং পাঁচ বছর টেসলার এআই বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন।
অটোরিসার্চের উন্নতিগুলো ছিল তুলনামূলক সাধারণ। এটি প্রশিক্ষণের শুরুতে ভালো মান নির্ধারণ করেছে, মডেলের মনোযোগের ক্ষেত্র বাড়িয়েছে এবং মডেলের মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার সমস্যা চিহ্নিত করেছে।
এসব নতুন কিছু নয়। তবে কারপাথির চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, 'ছোট ছোট উন্নতিগুলো একসঙ্গে যোগ হয়ে ন্যানোচ্যাটকে সত্যিই উন্নত করেছে।'
এ ধরনের অগ্রগতি আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বৃহৎ এআই মডেল তৈরির বড় অংশই আসলে অবকাঠামো সংযোগ, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং প্রশিক্ষণের নানা সূচক ঠিক করার মতো কাজ—যা আজকের এআইই অনেকাংশে করতে পারে।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক ল্যাব 'রিফ্লেকশন এআই'-এর গবেষক জো স্পিসাক বলেন, এআই এখন মানুষের মতো জটিল চিন্তা করার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কোনো নতুন আইডিয়া বা দক্ষতার খসড়া দিলে এটি ৩০ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্কেল প্ল্যান তৈরি করতে পারে, যা করতে মানুষের কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেত।
এর ফলে মানুষ এখন মূলত কেবল 'গবেষণা পরিচালক' হিসেবে কাজ করছে, যেখানে মূল কোডিং, ডিবাগিং এবং অপ্টিমাইজেশনের কাজ মডেলগুলো নিজেই করছে। এই উৎপাদনশীলতা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই ভীতিজনক। কারণ মানুষের ভূমিকা কমে গেলে একসময় পুরো ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে। এর শেষ পরিণতি হতে পারে এমন এক ব্যবস্থা—যা মডেলের মাধ্যমে তৈরি হবে, মডেলের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং তার নিরাপত্তা যাচাইও করবে কেবল মডেলই।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) পদার্থবিদ ও মেশিন-লার্নিং গবেষক ম্যাক্স টেগমার্ক এ পরিস্থিতিকে চোখ বেঁধে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তার মতে, চালক যদি চোখ না খোলে, তাহলে দুর্ঘটনা অনিবার্য।
অধ্যাপক টেগমার্ক কয়েকটি ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, শক্তিশালী এআই সিস্টেমগুলো সরকার ও বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা মানুষকে ক্ষমতাহীন করবে। দ্বিতীয়ত, এটি প্রথম প্রস্তুতকারককে চরম ক্ষমতা এনে দেবে, যা বিশ্বব্যাপী একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিতে পারে। অথবা এটি মানুষের অস্তিত্বের তোয়াক্কা না করে নতুন ডেটা সেন্টার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির জন্য মানুষকে উচ্ছেদ করতে পারে।
তিন বছর আগে টেগমার্ক বৈশ্বিক এআই উন্নয়ন স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর চলতি বছরের সিএসইটি প্রতিবেদনও বলেছে, আরএসআই থেকে জন্ম নেওয়া সিস্টেমগুলো 'চরম ঝুঁকি' তৈরি করতে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
তবে বাস্তব জগতে কিছু বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কম্পিউটিং শক্তি। দক্ষতা বাড়লেও নতুন মডেল প্রশিক্ষণে আগের তুলনায় আরও বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে অগ্রগতি অনেকাংশে ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতির ওপর নির্ভর করছে।
সিএসইটির অন্তর্বর্তী নির্বাহী পরিচালক হেলেন টোনারের মতে, সাধারণ গ্রাহকদের এআই ব্যবহারের চাহিদাও গবেষণার গতি কমিয়ে দিতে পারে।
কারণ ডেটা সেন্টারের সীমিত সক্ষমতা গ্রাহকসেবা, ভবিষ্যৎ মডেল প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা—এই তিন খাতে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন প্রশিক্ষণ ডেটা।
সাম্প্রতিক অগ্রগতির বড় অংশ এসেছে এমন ক্ষেত্রগুলোতে, যেখানে এআই নিজেই নিজের কাজের সাফল্য যাচাই করতে পারে। যেমন কোনো সফটওয়্যার চলে বা চলে না, কোনো গণিত প্রমাণ সঠিক বা ভুল।
এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে তৈরি ডেটা নিরাপদে প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা যায়।
কিন্তু সৃজনশীল লেখা, আইনগত বিচার বা বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে বোঝাপড়ার মতো ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটানো অনেক বেশি কঠিন।
যদি এআইকে বাস্তব পৃথিবী থেকেই শেখার প্রয়োজন হয়, তবে সেটিও স্বয়ং-উন্নয়নের গতি সীমিত করতে পারে।
তবু অনেকের মতে, 'চক্রটি সম্পূর্ণ করা'—অর্থাৎ এআইয়ের নিজের উন্নয়ন নিজেই পরিচালনা করার ক্ষমতা অর্জন—সুপারইন্টেলিজেন্সের পথে একটি বড় ধাপ। আর এর মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতা কি কোনো কল্পরাজ্য নাকি ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আপনি ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখেন তার ওপর।
সব মিলিয়ে, স্ব-উন্নয়নের এই বন্ধ চক্রটি সুপারইন্টেলিজেন্স বা অতি-বুদ্ধিমত্তার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হলেও, এর মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতা কি কোনো কল্পরাজ্য নাকি ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে—তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা।
