৮০ বছর ধরে অমীমাংসিত বিখ্যাত এক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করল এআই
প্রায় আট দশক ধরে মানব গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রাখা একটি বিখ্যাত গণিত সমস্যার সমাধান করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের একটি এআই মডেল 'ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম' নামে পরিচিত সমস্যাটির সমাধান করেছে—যা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের নাগালের বাইরে ছিল।
কয়েক বছর আগেও উন্নত এআই মডেলগুলো সাধারণ গাণিতিক সমস্যায় হোঁচট খেত। অথচ এখন তারা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের স্বর্ণপদকজয়ী শিক্ষার্থীদের সমমানের পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম। সর্বশেষ তারা কম্বিনেটোরিয়াল জ্যামিতির একটি ঐতিহাসিক সমস্যার সমাধানে বীজগাণিতিক সংখ্যা তত্ত্ব ব্যবহার করেছে।
এআই মডেলটিকে নিচের প্রম্পট দেওয়া হয়েছিল-
এর জবাবে এটি নিচের গাণিতিক প্রমাণ উপস্থাপন করে-
সংখ্যা ও জটিল সমীকরণে অভ্যস্ত নন এমন পাঠকদের জন্য ওপেনএআই তাদের ফলাফল ব্যাখ্যা করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি এআইয়ের সমাধানের সঙ্গে খ্যাতনামা গণিতবিদদের ১৯ পৃষ্ঠার বিশদ মন্তব্য ও ব্যাখ্যাও প্রকাশ করে, যাতে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা সমানভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেন।
সাধারণভাবে গণিতবিদরা অতিরঞ্জিত দাবি বা প্রচারণার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক। কোনো নতুন আবিষ্কার বা যুগান্তকারী দাবি গ্রহণ করার আগে তারা কঠোর প্রমাণ দেখতে চান। এমনকি প্রাথমিক বা আপাতদৃষ্টিতে সহজ তথ্যও প্রমাণ ছাড়া তারা মেনে নিতে রাজি নন। এ কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দেবে—এমন ধারণা নিয়ে অনেক গণিতবিদ এতদিন সন্দিহান ছিলেন।
এরপর যখন বিশিষ্ট গণিতবিদদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়, তখন আরও আলোড়ন তৈরি হয়।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোগা অ্যালন বলেন, 'অনেক অসাধারণ মানব গবেষক যে কাজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, এআই সেখানে সফল হয়েছে।'
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েল লিটের মন্তব্য, 'এটাই প্রথম এআই-উৎপাদিত ফলাফল, যা নিজস্ব গুরুত্বের কারণেই আমাকে উচ্ছ্বসিত করেছে; ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে নয়।'
আর ফ্রান্সের কলেজ দ্য ফ্রান্সের অধ্যাপক ও ফিল্ডস মেডেলজয়ী গণিতবিদ টিমোথি গাওয়ার্স বলেন, 'ইউনিট ডিস্ট্যান্স সমস্যার এই সমাধান এআই-ভিত্তিক গণিত গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। কোনো মানুষ যদি এই গবেষণাপত্র লিখে 'অ্যানালস অব ম্যাথেমেটিকস'-এ জমা দিতেন এবং আমাকে মতামত দিতে বলা হতো, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় তা প্রকাশের সুপারিশ করতাম। এর আগে কোনো এআই-সৃষ্ট প্রমাণ এর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।'
মানব গণিতবিদদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি ফিল্ডস মেডেলের বিজয়ী হিসেবে গাওয়ার্সের এই মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তার মতে, এআই আর কখনো উন্নত না হলেও গণিত গবেষণায় ইতোমধ্যে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, 'গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন হয়ে উঠবে।'
জটিল গাণিতিক সূত্র দেখলেই অনেকের মাথা ঘুরে যেতে পারে। কিন্তু এই সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এআই আসলে কী আবিষ্কার করেছে, মানুষ কেন এতদিন তা খুঁজে পায়নি এবং গণিত থেকে দূরে থাকতে চাওয়া সাধারণ মানুষের জন্যও এই অগ্রগতি কেন গুরুত্বপূর্ণ।
ওপেনএআইয়ের গবেষকদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, মাত্র এক বছর আগেও এমন ফলাফল কল্পনাতীত ছিল।
গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবেক বলেন, 'এক বছর আগের কথা ভুলে যান। এক মাস আগেও এমন কিছু অকল্পনীয় ছিল।'
এই প্রেক্ষাপটে আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে সমস্যাটির ইতিহাস। প্রায় ৮০ বছর আগে এটি উত্থাপন করেছিলেন কিংবদন্তি গণিতবিদ পল এরদশ, যিনি ইতিহাসের অন্যতম উৎপাদনশীল গণিতবিদ হিসেবে পরিচিত। অদ্ভুত জীবনযাপন, নিরন্তর ভ্রমণ এবং অবিরাম গবেষণার জন্যও তিনি বিখ্যাত ছিলেন।
গবেষণাকর্মের পাশাপাশি এরদশ অসংখ্য গাণিতিক প্রশ্ন রেখে গেছেন, যেগুলো 'এরদশ প্রবলেম' নামে পরিচিত। গণিতের অগ্রগতি পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে এগুলো বিবেচিত হয়।
কোনো সমস্যাকে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তা বোঝা যেত সমাধানকারীর জন্য ঘোষিত পুরস্কারের অঙ্ক দেখে। 'ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম' ছিল তার প্রিয় সমস্যাগুলোর একটি। শুরুতে এর সমাধানের জন্য ৩০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৫০০ ডলার করা হয়।
এরদশ গাণিতিক সমস্যাগুলোকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতেন। এক ধরনের সমস্যাকে তিনি 'মার্শম্যালো' বলতেন—যেগুলো সাময়িক আনন্দ দেয়। আর অন্য ধরনের সমস্যাকে বলতেন 'অ্যাকর্ন'—যেগুলোর সমাধানের জন্য গভীর ও সূক্ষ্ম নতুন অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োজন এবং যেখান থেকে ভবিষ্যতে বিশাল জ্ঞানভান্ডার গড়ে উঠতে পারে।
'ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম' ছিল সেই দ্বিতীয় ধরনের একটি বড় 'অ্যাকর্ন'। আর ওপেনএআইয়ের লক্ষ্য ছিল সেটির সমাধান খুঁজে বের করা।
'ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম'-এর সহজ রূপ হলো—যদি আপনি একটি কাগজে 'n' সংখ্যক বিন্দু বসান, তবে ঠিক কত জোড়া বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব নিখুঁতভাবে ১ ইউনিট হবে? ১৯৪৬ সালে এরডশ দেখিয়েছিলেন যে এই বিন্দুগুলোকে গ্রিড আকারে সাজালে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার জোড়া পাওয়া যায় এবং তার অনুমান ছিল যে অন্য কোনো উপায়ে এর চেয়ে বেশি জোড়া পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ওপেনএআই-এর তৈরি মডেলটি এমন একটি বিন্যাস খুঁজে বের করেছে যা এরডশের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। অর্থাৎ, এই প্রমাণটি ছিল মূলত একটি 'ভুল প্রমাণ' বা ডিসপ্রুফ।
ওপেনএআই-এর গবেষকেরা এই সফলতা দেখে থমকে গিয়েছিলেন। তারা মূলত নিজেদের নতুন মডেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য এই জটিল সমস্যাটি এআই-কে সমাধান করতে দিয়েছিলেন। ওপেনএআই-তে কর্মরত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ মেহতাব সাহনি বলেন, 'আমি শুরুতে এটি বিশ্বাসই করতে পারিনি।' তাই তারা ভুল খুঁজতে শুরু করেন এবং অন্য বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ফলাফলটি পুনরায় যাচাই করান। শেষ পর্যন্ত কোডিং এজেন্টের সাহায্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এআই-এর করা সমাধানটি সম্পূর্ণ সঠিক এবং অসাধারণ।
মানুষ যেখানে দশকের পর দশক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, এআই সেখানে কীভাবে সফল হলো—এর পেছনে গবেষকেরা তিনটি মূল কারণ দেখিয়েছেন:
প্রথমত, এই সমাধানটি মানুষের চিন্তাভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। মানুষ যেখানে এরডশের তত্ত্বটিকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল, এআই সেখানে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক উপায়ে একে ভুল প্রমাণ করার পথ খুঁজে নেয়।
দ্বিতীয়ত, মানুষ সাধারণত নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হলেও এআই একাধিক ক্ষেত্রের জ্ঞান একত্রে ব্যবহার করতে পারে। এই ক্ষেত্রে মডেলটি বীজগাণিতিক সংখ্যা তত্ত্ব এবং বিচ্ছিন্ন জ্যামিতির ধারণাকে একত্র করেছে—যে দুটি ক্ষেত্রকে সাধারণত খুব কাছাকাছি মনে করা হয় না।
তৃতীয়ত, এআই ক্লান্ত হয় না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে একই সমস্যার পেছনে লেগে থাকতে পারে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মডেলটির চিন্তাপ্রক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত সংস্করণই ছিল ৭৫ হাজার শব্দের বেশি, যা 'হ্যারি পটার'-এর প্রথম বইয়ের দৈর্ঘ্যের সমান। পুরো সমাধানটি বের করতে এআই-এর সময় লেগেছে মাত্র ৩২ ঘণ্টা এবং এক হাজার ডলারের কম কম্পিউটিং ব্যয় হয়েছে।
এই সাফল্যের পরও ওপেনএআইয়ের গবেষকেরা মনে করেন না যে গণিতবিদদের ভূমিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং তারা এটিকে ক্যালকুলেটর বা দাবা-কম্পিউটারের মতো একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, এআই নতুন ধারণা ও পদ্ধতির জন্ম দিতে পারে, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ আরও বড় সমস্যার সমাধান খুঁজবে। ইতোমধ্যে গবেষকেরা এই সমাধানের কৌশল ব্যবহার করে অন্যান্য দীর্ঘদিনের গণিত সমস্যার দিকেও নজর দিচ্ছেন।
ওপেনএআই গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবেক বলেন, 'একটি যুগান্তকারী অগ্রগতির অর্থ হলো, হঠাৎ করেই আগে অসম্ভব মনে হওয়া অনেক কিছু সম্ভব হয়ে ওঠে।'
তবে তিনি স্বীকার করেন, এআই এখনো মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গাণিতিক আবিষ্কারগুলোর সমতুল্য সৃজনশীলতার প্রমাণ দেয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার ও অগ্রগতির চালিকাশক্তি হওয়ার সক্ষমতা যে এআই অর্জন করছে, সাম্প্রতিক এই সাফল্য তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
