মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খোলার আশা, কিন্তু নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে সিন্ডিকেটের ভয়
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধন না করেই আবার কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিতর্কিত কর্মী নিয়োগ সিন্ডিকেট ব্যবস্থা আবার ফিরে আসার আশঙ্কায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এ সমঝোতা স্মারকই অতীতে এই অনৈতিক চর্চাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দলের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই সফর দুই বছর বন্ধ থাকার পর শ্রমবাজার আবার খোলার আশা জাগালেও রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হওয়া সিন্ডিকেট মডেল আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'যতদিন দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এমওইউ সংশোধন করা না হচ্ছে, ততদিন সিন্ডিকেটের মূল হোতারা এর সুযোগ নিতেই থাকবে। এবারও দুইদেশেই সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগীরা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু নতুন শর্ত আরোপ করেছে, যা সিন্ডিকেট গঠনে উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৫০০ এজেন্সি সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স পেয়েছে। কিন্তু তাদের সবাইকে সমান সুযোগ না দিয়ে এই নতুন শর্তগুলো আমাদের সরকারের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।'
গত ৬ মে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের দেওয়া শর্তে রাজি না হলে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধই থাকবে। এরপর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'বাস্তবতা হচ্ছে, মার্কেট বন্ধই আছে। আমরা যদি সিন্ডিকেট কিংবা ফেয়ার রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম—যা-ই বলেন—তাদের এই ধরনের শর্তে রাজি না হই, তবে মার্কেট যেভাবে বন্ধ আছে সেভাবেই থাকবে।'
নুর জানান, মালয়েশিয়া ১০টি শর্ত দিয়েছিল। সেসব শর্ত মানলে বাংলাদেশে ৫ থেকে ৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির বেশি কেউ কর্মী পাঠাতে পারবে না
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনটি শর্ত মওকুফ করা সম্ভব হয়। এরপর ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির জমা দেওয়া হয় তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে। কিন্তু তারপরও শ্রমবাজারটি বন্ধই রয়েছে।
নুর জানান, বাংলাদেশের মন্ত্রী সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করেছেন। সে সময় অনুরোধ করেছেন, মালয়েশিয়ার শর্তে যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেই এজেন্সিগুলোকে যেন কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
অবশ্য গত ১৮ মে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় খোলার লক্ষ্যে বিতর্কিত নিয়োগ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমাদের জিহাদ।'
বাজার কবে নাগাদ খুলবে জানতে চাইলে আরিফুল উত্তর দেন, 'খুব তাড়াতাড়ি হবে।'
নতুন শর্তগুলো যেভাবে আলোচনায় আসে
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়।
পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। এই শর্তগুলো হলো—গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও গত তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়ে পাঠিয়ে এই শর্তগুলো মওকুফের অনুরোধ করেন।
বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, একই মানদণ্ডের আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের এজেন্সিগুলোকে বাছাই করা হবে।
তবে নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দি অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য মালয়েশিয়ার প্রস্তাবিত এই মানদণ্ড প্রত্যাখ্যান করেছে।
সেই সময় বায়রার অনেক সদস্য সরকারকে এই অন্যায্য শর্তগুলো মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, স্বল্পসংখ্যক এজেন্সির মধ্যে কর্মী পাঠানোর অধিকার সীমাবদ্ধ করে দিয়ে এটি আরেক সিন্ডিকেটের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
সিন্ডিকেট ব্যবস্থা চালুর পর থেকে বারবার বন্ধ হয়েছে বাজার
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তথ্যমতে, সিন্ডিকেট ব্যবস্থার শুরু ২০১০ সালে। সে সময় অনুমোদিত এজেন্সির সংখ্যা প্রথমে মাত্র ১০টি করা হয়েছিল। পরে এটি শ্রম অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়।
সম্প্রতি ১০০টি এজেন্সির সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, তারা ২০২৪ সালের মে মাসের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৮ হাজার কর্মী পাঠাতেও ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে আবারও বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার যদিও এ ধরনের অভিযোগের সম্মুখীন হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন যে বর্তমান প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ না হলে আবারও সেই একই ব্যবস্থার পুনরুত্থান ঘটতে পারে।
সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, স্বল্প খরচে অভিবাসন নিশ্চিত করা, দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গত ৯ এপ্রিল প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদার ভিত্তিতে 'বিশ্বস্ত ও যোগ্য' এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই শব্দগুলোর অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা সতর্ক করে বলছেন, কর্মী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়াই নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।
আলতাব খান সতর্ক করে বলেন, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ফিরে এলে দলটির সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
'যদি সিন্ডিকেট আবার ফিরে আসে, তবে তা বিএনপির স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে নষ্ট করবে এবং জনগণের আস্থা কমিয়ে দেবে,' বলেন তিনি।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসন রুটের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করা মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, উভয় দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট গঠনে ভূমিকা রেখে আসছে। এর ফলে শেষপর্যন্ত শোষণের শিকার হন কর্মীরা।
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমান সরকারও যদি একই পথে হাঁটে, তবে শ্রম অভিবাসন খাতে স্বচ্ছতা আনা এবং স্বল্প খরচে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হবে।' মালয়েশিয়ার দেওয়া এসব 'অযৌক্তিক শর্ত' এড়াতে বাংলাদেশকে আরও জোরালোভাবে আলোচনায় যুক্ত হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
দুই দেশের ওই যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো ও খরচ কমানোর লক্ষ্যে মালয়েশিয়া প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম এআই-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) 'এমপ্লয়ার পেইজ প্রিন্সিপল' নীতির আওতায় নিয়োগের সব খরচ নিয়োগকর্তারাই বহন করবেন।
বাংলাদেশ এই উদ্যোগকে সমর্থন জানালেও ফখরুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, 'বিনা খরচে অভিবাসন' (জিরো-কস্ট মাইগ্রেশন) ধারণাটি আবার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের নতুন কোনো পথ তৈরি করবে কি না।
তিনি বলেন, 'বিনা খরচে অভিবাসনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আবারও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্রয় দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শেষপর্যন্ত কর্মীদেরই সেই বাড়তি খরচ বহন করতে হবে এবং অধিকাংশ এজেন্সি বৈষম্যের শিকার হবে।'
স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, বাংলাদেশ যদি আলোচনায় শক্ত অবস্থান নিলে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে তারা নেপালের উদাহরণ টেনেছেন। নেপাল এ ধরনের চাপ উপেক্ষা করেও কোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, 'মালয়েশিয়া একা কোনো সিন্ডিকেট চাপিয়ে দিতে পারে না। বাংলাদেশ চাইলে তা ঠেকাতে পারে।'
২০০৮ সালের আগে বাংলাদেশি কর্মীরা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে মালয়েশিয়ায় চাকরির ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাস নাগাদ এই খরচ প্রায় ৬ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যদিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অভিবাসনের সরকারি খরচ নির্ধারণ করেছে ৭৯ হাজার টাকা।
বায়রা সূত্রের প্রাক্কলন অনুসারে, ২০২২ সালের আগস্টে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ার পর ১০০ এজেন্সির ওই সিন্ডিকেট অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভিযুক্ত অনেক সিন্ডিকেট নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যদিকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
