প্রতি হেক্টরে হাজার হাজার ইঁদুর, নষ্ট করছে ফসল, হানা দিচ্ছে বাড়িতে: নাজেহাল অস্ট্রেলিয়ার কৃষকেরা
অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকেরা এখন ইঁদুরের উপদ্রবে সন্ত্রস্ত। খেতের ফসল থেকে শুরু করে বসতবাড়ি—সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। শস্যখেত তছনছ করে ফসল নষ্ট করছে ইঁদুরের দল।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ এমনিতেই অনিশ্চিত। তার ফলে আগে থেকেই প্রবল চাপে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার কৃষকেরা। এর মধ্যেই গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো দেখা দিয়েছে এই নতুন উপদ্রব।
ইঁদুরের খাওয়া ফসল ফের নতুন করে বুনতে গিয়ে লাখ লাখ ডলার খরচ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কৃষকদের। শুধু তা-ই নয়, চাষের মূল্যবান সময় নষ্ট করে খেতের আনাচে-কানাচে ইঁদুর মারার বিষ মেশানো বীজ ছড়াতে হচ্ছে তাদের।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিনজিনিউতে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে গম, ক্যানোলা, লুপিন ও বার্লির চাষ করেন ৪৩ বছর বয়সি জেফ কসগ্রোভ। তিনি বলেন, 'এটি বিশাল অঙ্কের খরচ। আর এই ব্যয় কেবল ইঁদুরের বিষ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওরা রীতিমতো মাথার ভেতর চেপে বসে। রাতে ঘরের ভেতর, সিলিংয়ে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে (এসি) দাপিয়ে বেড়ায়। ওদের শব্দ শোনা যায়, গন্ধও পাওয়া যায়—মনে হয় যেন পচা লাশ।'
গত ২৫ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন কসগ্রোভ। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে মাত্র দুবার খেতে ইঁদুর মারার টোপ বা বিষ ব্যবহার করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২১ সালের ইঁদুরের উপদ্রবের চেয়েও এ বছরের পরিস্থিতি 'অনেক বেশি ভয়াবহ'।
ওই বছর অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে ইঁদুরের ঢল নেমেছিল। নিউ সাউথ ওয়েলসের বড় অংশ ও কুইন্সল্যান্ডের একাংশে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ইঁদুরের উপদ্রব দেখা দেয়।
নিউ সাউথ ওয়েলসের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, কারাগারের বিপুল ক্ষতি করায় সেখান থেকে শত শত বন্দিকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়।
বাম্পার ফলনে বেড়েছে ইঁদুর
কসগ্রোভের খামার থেকে প্রায় দু-ঘণ্টার পথ উত্তরে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার আরেকক বাসিন্দা বছর পাঁচেক আগের ইঁদুরের উপদ্রবের কথা স্মরণ করছিলেন। তিনি পেশায় কৃষিবিদ এবং কৃষক, ৫৯ বছর বয়সি বেলিন্ডা ইস্টো।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম জেরাল্ডটন। সেখান থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নোলবায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টরের একটি খামার চালান বেলিন্ডা।
তিনি বলেন, 'আগেরবার আমার হ্যান্ডব্যাগের মধ্যেও ইঁদুর ঢুকে গিয়েছিল। মেঝে, দেয়াল, ভাঁড়ারঘর—সব জায়গাতেই ছিল ওরা। তবে এ বছর অন্তত ভাঁড়ারঘরে ওদের দেখা পাইনি।'
এর কারণও জানিয়েছেন বেলিন্ডা। 'ওরা এখন সেখানেই থাকছে, যেখানে খাবার আছে। মূলত জমিতের রয়ে গেছে ওরা। গত বছর আমাদের রেকর্ড পরিমাণ ফসল হয়েছিল। সেই ফলনই এখন ইঁদুরের জন্য প্রচুর খাবারের জোগান দিচ্ছে।'
বাম্পার ফলনের অর্থ হলো, ফসল প্রক্রিয়াজাত করার সময়ে খেতে প্রচুর শস্য ছড়িয়ে পড়ে। আর ইঁদুরের জন্য তা সহজে নাগালের মধ্যে থাকা প্রিয় খাদ্যের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
বেলিন্ডা বলেন, 'এর পর গ্রীষ্মের বৃষ্টি শুরু হয়।' আর তাতেই জমি ভরে ওঠে সবুজ কচি কচি গাছে। 'ফলে ওরা শুধু স্টেক নয়, স্টেক আর সালাদ—দুটোই পেল। আক্ষরিক অর্থেই ইঁদুরের দল স্বর্গে বাস করছিল।'
প্রায় ৪০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন বেলিন্ডা। তার জমিতে গম, ক্যানোলা ও লুপিনের ফলন হয়। এর মধ্যে গম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি করা হয় উডন নুডলস তৈরির জন্য, অথবা দেশে বিস্কুট, পাউরুটি ও পাস্তা তৈরিতে কাজে লাগে।
তার ধারণা, খেতের প্রতি হেক্টরে প্রায় ৮-১০ হাজার ইঁদুরের বাস। 'মাঝেমাঝেই আমাদের ইঁদুরের উপদ্রব সহ্য করতে হয়। খাবার ফুরিয়ে গেলে ওদের সংখ্যা কমে আসে। কিন্তু এ বছর তা হয়নি। আমি রীতিমতো দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।'
'নতুন মাথাব্যথা'
শরৎকাল শস্যচাষিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়েই তারা বীজ বোনেন। কৃষিবিদ হিসাবে বেলিন্ডা কৃষকদের ফসল-সংক্রান্ত পরামর্শও দিয়ে থাকেন। এ বছর তিনি বীজ বোনার পর যত দ্রুত সম্ভব ইঁদুর মারার টোপ বা বিষ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষকদের।
তিনি বলেন, 'বীজ বোনার ঠিক পরেই যদি খেতে বিষ ছড়ানো না হয়, তবে রাতেই ইঁদুরের দল এসে মাটি খুঁড়ে সব বীজ খেয়ে নিচ্ছে। আপনি যদি রাত ৮টায় বীজ বোনা শেষ করে পরের দিন খেতে আসেন, দেখবেন সারি সারি ফসলের বীজ উধাও হয়ে গেছে।'
বেলিন্ডা আরও বলেন, কৃষকেরা অত্যন্ত সহিষ্ণু হন। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ডিজেল ও সারের দামে ঊর্ধ্বগতি তাদের বড় ধাক্কা দিয়েছে।
'দু-তিন মাস আগে আমরা জ্বালানির জন্য যা খরচ করতাম, এখন তার দ্বিগুণ খর করতে হচ্ছে। এর ওপর ইঁদুরের উপদ্রব নতুন মাথাব্যথা হয়ে চেপে বসেছে,' বলেন তিনি।
বিশাল সমস্যা
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিএসআইআরও-র গবেষক স্টিভ হেনরি ইঁদুরের স্বভাব এবং কীভাবে তাদের নির্মূল করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেন।
তিনি জানান, সাধারণত প্রতি হেক্টরে ৮০০ ইঁদুর থাকলে তাকে মহামারি বা উপদ্রব বলা হয়। 'কিন্তু পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি হেক্টরে হাজার হাজার ইঁদুরের কথা বলা হচ্ছে।' মূলত উত্তরে ও দক্ষিণের শস্য বলয়গুলোতে এই প্রকোপ বেশি বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া পরিদর্শনে গিয়েছিলেন হেনরি। সেখানে এক মিটার চওড়া একটি ফালি ধরে ১০০ মিটার হাঁটতেই অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি সক্রিয় ইঁদুরের গর্ত গুনতে পেরেছেন এই গবেষক।
ওই সংখ্যাকে ১০০ দিয়ে গুণ করে ইঁদুরের মোট সংখ্যা অনুমান করেন কৃষকেরা। সেই হিসাবে, প্রতি হেক্টরে অন্তত ৩-৪ হাজার গর্ত রয়েছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াতেও চিত্রটা কার্যত একই রকম।
গবেষক হেনরি বলেন, 'কৃষকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। তাই এই উপদ্রব বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করেছে।'
তিনি জানান, মাত্র ছয় সপ্তাহ বয়সেই ইঁদুর প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। প্রতি ১৯ থেকে ২১ দিন অন্তর তারা ছয়টি থেকে ১০টি করে ছানার জন্ম দেয়।
এই গবেষক বলেন, 'সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাচ্চা প্রসবের দু-তিন দিনের মধ্যেই তারা ফের গর্ভবতী হয়। অর্থাৎ প্রথমবারের ছানাদের লালনপালন করতে করতেই তারা দ্বিতীয়বারের জন্য গর্ভধারণ করে।'
তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এই উপদ্রবের মানসিক প্রভাবও রয়েছে। কারণ, সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও কৃষকদের এতটুকু স্বস্তি পান না।
'খরার মতো দুর্যোগ হলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে এসি চালিয়ে দেওয়া যায়। তাতে অন্তত কিছুটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু ইঁদুরের উপদ্রব হলে সেই উপায় নেই। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে যখনই আলমারি খুলবেন, দেখবেন সেখানেও ইঁদুর বসে আছে। রাতে ঘুমাতে গেলে দেখবেন, বিছানার উপর দিয়ে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।'
উপদ্রব কমাতে পারে শীত, বৃষ্টি ও কড়া বিষ
ইঁদুর মারার জন্য আরও কড়া বিষের আশায় কয়েক মাস ধরেই মরিয়া হয়ে ছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু সেজন্য জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে তাদের।
সম্প্রতি সেই অনুমোদন মিলেছে। ফলে কৃষকদের হাতে এখন আরও কড়া বিষ এসে পৌঁছেছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন ৬৭ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত কৃষক ডেমিয়েন রায়ান। পার্থের প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার উত্তরে মোরাওয়ায় তার একটি খামার রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজের বাড়ি ও খামারের গুদামঘর থেকে ইঁদুর ধরেই দিন কাটছে তার।
ডেমিয়েন জানান, প্রতিদিন তিনি বাড়ি থেকে ২০-৩০টি এবং গুদামঘর থেকে প্রায় দেড়শো ইঁদুর ধরছেন।
দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চাষবাস করছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে মাঝেমধ্যে দু-একবার ইঁদুরের উপদ্রব হওয়াটা তার কাছে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু 'পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ আগে কখনও হতে দেখিনি।'
তিনি বলেন, 'এ যেন সত্যিই মহামারি। রাতে গাড়ি নিয়ে বেরোলেই দেখা যাবে, চারপাশে শুধু ইঁদুর আর ইঁদুর ছোটাছুটি করছে।'
তবে তাপমাত্রা কমা, বৃষ্টির পূর্বাভাস ও কড়া বিষ ব্যবহারের ফলে সম্প্রতি ইঁদুরের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
শীত প্রায় দোরগোড়ায়। তাই দ্রুত উপশম মিলবে বলে আশায় বুক বাঁধছেন কসগ্রোভ। 'খুব ঠান্ডা আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া হয়ে গেলে শেষমেশ ওদের দাপট কমবেই।'
