বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: প্রয়োজন স্বাধীন ব্যয় নিরীক্ষা ও কার্যকর সংস্কার
রাষ্ট্রীয় সম্পদের জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল চেতনা। কিন্তু জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে আর্থিক বোঝা বাড়ানো সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। বর্তমানে নবম বেতন স্কেল বাস্তবায়নের দাবি এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুতের নতুন মূল্য নির্ধারণের সম্ভাবনা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখন জরুরি হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ খাতের অতীতের অসংগতি, দুর্বলতা ও অস্বচ্ছতা চিহ্নিত করে জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব সংস্কার নিশ্চিত করা।
কাঠামোগত দুর্বলতা কোথায়
বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরেই বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা বিদ্যমান রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত সাধারণত শীর্ষ পর্যায়ের আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে নেওয়া হয়। প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যয় নির্ধারণে মূলত কাগজনির্ভর আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করা হয়, ফলে প্রকৃত ব্যয় যাচাই কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং প্রদর্শিত বিনিয়োগ ব্যয়ের ওপর ক্যাপাসিটি চার্জ যুক্ত করে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নিরীক্ষক বা পেশাদার ব্যয় বিশ্লেষকের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকায় প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই সম্ভব হয় না। এতে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে লেখকের মত।
প্রশাসনিক ব্যয়ে অসংগতি
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে উৎসাহ বোনাস, ইনসেনটিভ বোনাস ও ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়, যা ব্যয় সাশ্রয় ও জনস্বার্থের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জ্বালানি খাতে অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ
২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট জ্বালানির মধ্যে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও কয়লার অংশ ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে কারিগরি কনজাম্পশন ফ্যাক্টরের তুলনায় প্রকৃত ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে।
২০২২ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি মোহাম্মদ শামসুল আলম প্রশ্ন তোলেন, প্রতি ইউনিট জ্বালানি খরচ পাওয়ার ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ০৪ টাকা হলেও রামপালে তা ৭ দশমিক ৪৭ টাকা কেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহারে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তবে এসব অসংগতির কার্যকর ব্যাখ্যা ও সংশোধন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর চাপ জনগণের ওপরই পড়ছে।
মূল্য নির্ধারণে প্রশ্ন
বিইআরসি পাইকারি ও খুচরা—দুই স্তরে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করে। তবে লেখকের মতে, ক্রয়মূল্যই যদি ন্যায্য না হয়, তাহলে পাইকারি ও খুচরা মূল্যও ন্যায্য হওয়ার সুযোগ কমে যায়।
বাউবো ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য বিইআরসিতে আবেদন করে। আবেদনে ব্যয়ের তথ্য তিনটি কলামে উপস্থাপন করা হয়—পূর্ববর্তী অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয় এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক্কলিত ব্যয়।
এতে উৎপাদন বৃদ্ধির হার ধরা হয় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির হার দেখানো হয় ৯ দশমিক ১২ শতাংশ। লেখকের মতে, উৎপাদনের তুলনায় ব্যয়ের এই অতিরিক্ত বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকৃত জনবল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৯৫ দশমিক ১৭ মিলিয়ন টাকা। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য তা প্রাক্কলন করা হয় ৪ হাজার ২৩৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন টাকা। পরে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৪৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন টাকা, যা প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক কম।
একইভাবে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, অফিস ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং অবচয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়া যায়।
বিশেষ করে ওভারহেড খরচের বিস্তারিত তফসিল ছাড়াই বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার থেকে পূর্ববর্তী দুই অর্থবছরে মুনাফা অর্জিত হলেও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতি দেখানো হয়েছে, যার পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
কী করা দরকার
লেখকের মতে, বিদ্যুৎ খাতে স্বাধীন ব্যয় নিরীক্ষা ও 'ভ্যালু ফর মানি' অডিট বাধ্যতামূলক করা হলে প্রকল্প ব্যয়ের বাস্তবতা যাচাই, উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের যথার্থতা নির্ধারণ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।
তিনি চার স্তরে স্বাধীন নিরীক্ষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি স্বাধীন প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বাধীন কস্ট অডিটর ও পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্টের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরে পাইকারি ও খুচরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও স্বাধীন কস্ট অডিটরের ব্যয় বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শেষ কথা
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাত শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের ভিত্তি। তাই মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও স্বাধীন ব্যয় নিরীক্ষা নিশ্চিত না হলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সিএমএ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
এ কারণে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি স্তরে স্বাধীন ব্যয় নিরীক্ষা এবং দক্ষ ব্যয় বিশ্লেষক হিসেবে সিএমএ পেশাজীবীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জন্য ন্যায্য মূল্যে বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে লেখকের মত।
লেখক: মো. মামুনুর রশিদ মণ্ডল, অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, গ্রুপ রিদিশা
