বিনিয়োগ বাড়াতে সুরক্ষা নীতি পরিহার ও বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করার তাগিদ বিডা প্রধানের
দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত 'সুরক্ষা নীতি' থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। একইসঙ্গে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার (১১ মে) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত 'বাণিজ্য নীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগ প্রভাব এবং ভোক্তা কল্যাণ' শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিডা প্রধান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পে সুরক্ষা নীতি যে চিরকাল রাখা সম্ভব নয়, সে বিষয়ে এখন একটি ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরে অদক্ষতার কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই এর মাসুল গুনতে হয়। শুধুমাত্র উচ্চ শুল্ক নয়, বরং পণ্য সরবরাহ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে অদক্ষতার কারণে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, 'পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে নানা সমস্যা তৈরি হয়।' এর মধ্যে লজিস্টিকস খাতের বাধা, বন্দর পরিচালনায় অদক্ষতা এবং ব্যবসার বিভিন্ন স্তরে 'রেন্ট-সিকিং' বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাকে তিনি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
দেশের মূল চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা নীতি প্রণয়ন নয়, বরং এর বাস্তবায়ন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'নীতিগত পর্যায়ে অনেক সমস্যার সমাধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই।' বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানি, বন্দর থেকে পণ্য খালাস এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, তা বাস্তবায়নের অভাবেই প্রকট হচ্ছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার এখন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। দেশি বিনিয়োগকারীদের চেয়ে বিডা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বেশি গুরুত্ব দেয়—এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, 'বিডার দায়িত্ব হলো সরকারের অভ্যন্তরে থেকে দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর পক্ষে কথা বলা। বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগের বড় অংশই আসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।'
তিনি আরও যোগ করেন, বিদেশি বিনিয়োগ দেশে প্রযুক্তি ও দক্ষতা নিয়ে আসলেও দেশীয় বিনিয়োগই হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
অনুষ্ঠানে বিডা প্রধান জানান, বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের (এনবিআর) কাছে ৪৬টি সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি প্রস্তাবই নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ সংক্রান্ত। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে ভ্যাট ব্যবস্থায় একটি সুসংগঠিত 'স্ল্যাব সিস্টেম' প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কমাবে।
জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে আশিক মাহমুদ বলেন, 'যতক্ষণ না আমরা জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে পারছি, ততক্ষণ বিনিয়োগ নিয়ে বড় বড় কথা বলা হলেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কঠিন হবে।'
পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় আরও অংশ নেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান, এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আশরাফ আহমেদ এবং অর্থনীতিবিদ এম মাশরুর রিয়াজ।
