হরমুজ প্রণালির কারণে ব্যাহত গ্যাস চালানের দ্বিগুণেরও বেশি প্রতি বছর অপচয় হচ্ছে: আইইএ
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারের যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি গ্যাস প্রতিবছর অপচয় হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ মিথেন লিকেজ এবং খনিতে অপ্রয়োজনীয় 'ফ্লেয়ারিং' (গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা) নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায়— এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)।
আইইএ-র তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ বা ১১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার এই কৌশলগত প্রণালি দিয়ে পার হয়েছে।
সংস্থাটি হিসাব করে দেখেছে যে, তেল ও গ্যাস উত্তোলনের সময় মিথেন নির্গমন রোধে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বছরে ১০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এছাড়া জরুরি প্রয়োজন ছাড়া 'ফ্লেয়ারিং' বন্ধ করে আরও ১০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশ যখন নতুন জ্বালানি উৎসের সন্ধানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আইইএ বলছে যে অন্যান্য জায়গায় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ গ্যাস 'উৎপাদনশীল কাজে' লাগানো হচ্ছে না।
মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু স্বল্পস্থায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস। এটি ২০ বছরের সময়সীমায় কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় ৮০ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে সক্ষম। তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং বিতরণের সময় পাইপলাইনের লিকেজ, ফ্লেয়ারিং এবং ভেন্টিংয়ের মাধ্যমে এই গ্যাস পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য এই মিথেন গ্যাস দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মিথেন নিঃসরণ রোধ করাকে, নিকট-মেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেন বিজ্ঞানীরা।
আইইএ-র প্রধান জ্বালানি অর্থনীতিবিদ টিম গোল্ড বলেন, "এটি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় নয়; মিথেন ও ফ্লেয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করলে বড় ধরনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশেষ করে বর্তমান সংকটের সময়ে যখন বিশ্ব মরিয়া হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি প্রাপ্তির পথ খুঁজছে।"
যদিও বড় পরিসরে এই লক্ষ্য অর্জন করতে সময় লাগবে, তবে আইইএ বলছে, উদ্বৃত্ত উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক দেশগুলো যদি কিছু 'প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা' গ্রহণ করে, তাহলে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ১৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে—যা বর্তমান অস্থিতিশীল গ্যাস বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে পারে।
এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মধ্যে পাইপলাইনের লিকেজ মেরামত করা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করা এবং গ্যাস পুড়িয়ে না ফেলে— তা সংগ্রহ করার মতো তুলনামূলক সহজ পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিথেন নিঃসরণ কমানোর জন্য জ্বালানি খাতের ওপর বৈশ্বিক চাপ বেড়েছে। তবে সোমবার আইইএ জানিয়েছে, ২০২৫ সালেও জ্বালানি খাতে সামগ্রিক মিথেন নিঃসরণ রেকর্ড মাত্রার কাছাকাছি রয়ে গেছে।
সোমবার প্যারিসে মিথেন নিঃসরণ রোধে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদনটি পেশ করা হয়েছে।
এমন এক সময়ে এই প্রতিবেদনটি সামনে এল যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া মিথেন আমদানির পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ শিথিল ও পিছিয়ে দেওয়ার জন্য এই চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) 'ইন্টারন্যাশনাল মিথেন ইমিশনস অবজারভেটরি' জানিয়েছে, গত ছয় মাসে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা ৫০টি বড় মিথেন লিকেজের মধ্যে ১৭টিই তেল ও গ্যাস উৎপাদনের স্থাপনাগুলোয় পাওয়া গেছে।
এই ১৭টি স্থাপনা থেকে লিক হওয়া মিথেন সংগ্রহ করা গেলে— প্রায় ১ বিলিয়ন কিউবিক মিটার প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া সম্ভব—যা দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বাড়িতে এক বছরের তাপ নিয়ন্ত্রণ বা হিটিংয়ের জ্বালানি নিশ্চিত করা যাবে।
শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে বড় মিথেন লিকেজগুলোর মধ্যে ২২টি কয়লা খনি এবং বিশেষ করে খনির ভেন্টিলেশন শ্যাফটগুলোতে পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের মতে, অত্যন্ত কম খরচে এই নিঃসরণ কমানো বা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
