নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ার মধ্যেই ইরানি তেল ক্রয় নিয়ে চীনকে সতর্ক করল যুক্তরাষ্ট্র
সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে অনুরোধ করেছে যেন তারা ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, চীনের পক্ষ থেকে ইরানের তেল কেনা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের শামিল। এই কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয় চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আগে।
এই হুঁশিয়ারিটি দিয়েছেন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, যিনি উচ্চ-পর্যায়ের এই বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণ করবেন। বেসেন্ট নতুন নিষেধাজ্ঞার একটি জোরালো প্রচারণার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজছেন, যাতে বাড়তে থাকা জ্বালানির দামের প্রভাব কমানো যায়। সোমবার গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪.৪৫ ডলারে পৌঁছায়।
সোমবার ফক্স নিউজকে বেসেন্ট বলেন, "দেখা যাক চীন কিছু কূটনীতি নিয়ে এগিয়ে আসে কি না এবং ইরানকে প্রণালি খুলে দিতে রাজি করাতে পারে কি না।" তিনি আরও বলেন, "ইরান সন্ত্রাসবাদের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক এবং চীন তাদের ৯০ শতাংশ জ্বালানি কিনছে, তাই তারা সন্ত্রাসবাদের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষককে অর্থায়ন করছে।"
এক বছর আগে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে 'ট্রেড ওয়ার' শুরু এবং চীন পাল্টা জবাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় দুই দেশের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়ে ছিল, তা কিছুটা কমেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে, কারণ চীনের ইরানি তেল কেনা ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে।
সাম্প্রতিক সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তীব্রতর করেছে। এটি বিশেষভাবে চীনের স্বাধীন 'টিপট' রিফাইনারিগুলোকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করছে যে ইরান ও চীনের মধ্যে তেল বিক্রিতে সহায়তা করলে তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে।
ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট গত ২৪ এপ্রিল একটি স্বাধীন চীনা শোধনাগার হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ইরানের অন্যতম বৃহত্তম গ্রাহক। হেংলি বিপ্লবী গার্ডস কর্পসের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলারের ইরানি অপরিশোধিত তেল কিনেছে, যারা পুরো ইরানে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আছে।
কিন্তু চীন গত সপ্তাহান্তে এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং তাদের কোম্পানিগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দিয়েছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের একটি 'ব্লকিং মেজার' বা বাধা দেওয়ার বিধান কার্যকর করেছে, যা তাদের সংস্থাগুলোকে এমন বিদেশি আইন থেকে রক্ষা করে যেগুলোকে চীনা সরকার আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থি এবং অন্যায্য বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বলে মনে করে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সরঞ্জাম যা বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলোর লেনদেন বন্ধ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্পদ জব্দ করতে পারে, যা মূলত তাদের পশ্চিমা আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার বিষয়ে চীনের এই আদেশ বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির মধ্যে উত্তেজনার একটি নতুন পয়েন্ট তৈরি করবে এবং তাদের আর্থিক ব্যবস্থার আরও বিচ্ছেদের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
দুই নেতার বৈঠকের আগে চীন আরও কিছু উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গত সোমবার চীনা সরকার বলেছে যে, মেটা কর্তৃক সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা 'ম্যানাস'-এর অধিগ্রহণ বাতিল করতে হবে। ম্যানাস একটি সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক কোম্পানি হলেও এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চীনারা। এই পদক্ষেপটি অন্যান্য চীনা উদ্যোক্তাদের বিদেশি অংশীদারদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্প যখন শি-র সঙ্গে দেখা করবেন, তখন ইরান ইস্যুটি আলোচনার তালিকায় ওপরের দিকে থাকবে।
বেসেন্ট বলেন, "ইরানের হামলার হুমকির কারণে প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে—আমরা এটি পুনরায় চালু করছি। তাই আমি চীনাদের প্রতি আহ্বান জানাব যেন তারা এই আন্তর্জাতিক অভিযানকে সমর্থন করতে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।"
