কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি বাণিজ্য
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে ফের ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি বাণিজ্য। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই এই বন্দর দিয়ে ভারতে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। তবে বাণিজ্য আরও গতিশীল করতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর ভারতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সাল থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চলে আসছে। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন হিমায়িত মাছ, পাথর, সিমেন্ট, রড, আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। তবে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে প্লাস্টিক ফার্নিচার, পিভিসি সামগ্রী, তুলা, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং ফলের জুসের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্যগুলোর রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল এই বন্দরে। ভারতের কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সে দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের পণ্য বর্জনের চাপ দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের মে মাসে কয়েকটি পণ্য আমদানিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি আয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
এদিকে, ভারত থেকে পণ্য আমদানি অনিয়মিত হওয়ায় রাজস্ব আয় কমেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষেরও। বর্তমানে যেসব পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে, তার বেশিরভাগই ত্রিপুরার বাইরে থেকে আনতে হয়। ফলে উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না হওয়ায় আমদানিতে অনীহা দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, নিষিদ্ধ পণ্য ব্যতিত সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে।
আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত মার্চ পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে ৪৩৭ কোটি ১৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার পণ্য (চাল, জিরা ও আগরবাতি), যা থেকে সরকার ৭১ লাখ ৩২ হাজার টাকা রাজস্ব পেয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে ৫১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি এবং ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকার পণ্য আমদানি হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্কের তিক্ততা কমতে শুরু করায় ব্যবসায়ীরা এখন ভারতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার দাবি তুলেছেন।
আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী রাজীব ভূঁইয়া বলেন, "অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। এর ফলে ধীরে ধীরে পণ্য রপ্তানি বাড়ছে। তবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্যগুলো পুনরায় রপ্তানির অনুমোদন পেলে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় আরও বাড়বে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি সরকারেরও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।"
আখাউড়া স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, "আমরা ভারতে নতুন কিছু পণ্য রপ্তানির চেষ্টা করছি এবং এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা চলছে। এছাড়া যদি আমাদের সব পণ্য আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়, তবে বন্দর দিয়ে পুনরায় আমদানি শুরু হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।"
আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার কাজী আল মাসুম বলেন, "আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে আমরা ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছি। যেসব পণ্যের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আছে, সেগুলো আগে বড় পরিমাণে রপ্তানি হতো। ব্যবসায়ীদের এই দাবির বিষয়টি আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) লিখিতভাবে জানিয়েছি। আশা করা যাচ্ছে, দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে অচিরেই এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে।"
