জ্বালানি সংকট নেই বলে কর্তৃপক্ষের আশ্বাস; তবু রাস্তায় যানবাহন কম, ফিলিং স্টেশনে লম্বা লাইন
গতকাল কর্মদিবস হওয়া সত্ত্বেও ঢাকার রাস্তায় যান চলাচল ছিল অস্বাভাবিক কম। ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকটের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছে, দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় ঢাকার বেশিরভাগ বেসরকারি পেট্রোল পাম্প কার্যত বন্ধ ছিল। তবে সরকারি স্টেশনগুলো খোলা ছিল; সেগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। চট্টগ্রামেও একই ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে এবং যান চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা নিয়মিত চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ করছে। পাশাপাশি এপ্রিলে কোনো সংকট হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছে।
স্বাভাবিক সরবরাহ সত্ত্বেও কেন পাম্পগুলোতে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, 'গত বছর যা সরবরাহ করেছি, এ বছরও তা-ই করছি। পাম্প মাঝে মাঝে বন্ধ থাকছে—এটাও আমরা দেখছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে এখনো প্যানিক বায়িং বন্ধ হয়নি। এর ফলে সরবরাহ চেইনে মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটছে।'
তিনি আরও বলেন, ডিপো থেকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের মতো একই পরিমাণ পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে। পাম্পগুলোতে কেন পেট্রোল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, সে প্রশ্ন পাম্প মালিকদের কাছে করার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাজ্জাদুল করিম কাবুল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল সরকারের সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন, অকটেন ৯ হাজার ২১ টন ও পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ টন।
দেশে দৈনিক দৈনিক ১২ হাজার টন ডিজেল, ১ হাজার ২০০ টন অকটেন ও ১ হাজার ৪০০ টন পেট্রোলের চাহিদা রয়েছে। এ হিসাবে মজুত থাকা ডিজেলে ১০ দিন, অকটেনে ৮ দিন ও পেট্রোলে প্রায় ৯ দিন চলবে।
মজুত প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করছে। মার্চ মাসে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ২৫ দিনের ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদার সমান।
গতকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দেশব্যাপী একাধিক অভিযানে কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে মজুত করা ৩০ হাজার ৪৩৩ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করেছে। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন ব্যক্তিকে জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদান করেন।
ঘাটতি নেই, প্যানিক বায়িংয়ে পাম্পে দীর্ঘ লাইন হচ্ছে: জ্বালানিমন্ত্রী
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল সংসদে বলেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। বরং মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি কিনছে বলেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বিশেষ করে সিলেটে পেট্রোল পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অন্যান্য জায়গায় দীর্ঘ সারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানতে চান কখন এই পরিস্থিতির সমাধান হবে।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত ঘটনার পর জ্বালানির চাহিদা বেড়ে গেছে। 'আগে যে তেল বিক্রি হতে এক থেকে দেড় দিন সময় লাগত, এখন তা দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'পেট্রোল সরবরাহ হচ্ছে না—এমুন দাবি সঠিক নয়। প্রতিদিনই পাম্পে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।'
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটতে পারে।
লোডশেডিং কমাতে সরকার কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা সীমিত করা, ব্যবহারের পর বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির উপরে রাখা এবং বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় এমন যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত করা।
ঢাকার পাম্পগুলোর চিত্র
গতকাল সকালে আসাদ গেটের কাছে দুটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, একটি বেসরকারি স্টেশন বন্ধ রয়েছে, আর সরকারি পাম্পটি গ্রাহকদের জানাচ্ছে যে সকাল ১১টা থেকে জ্বালানি পাওয়া যাবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে দুপুর ১টার দিকে চালকরা জ্বালানি পান।
কল্যাণপুর-দারুসসালাম রোডের খালেক ফিলিং স্টেশন ও মিরপুর-২-এর একটি পাম্পে কোনো জ্বালানি ছিল না এবং স্টেশনগুলো বন্ধ ছিল। তবে সরকার পরিচালিত আরেকটি স্টেশন খোলা ছিল, যেখানে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
