ভোটের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে মানুষ: মহাসড়কে তীব্র যানজট, বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে টানা চার দিনের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন লাখো মানুষ। ভোট দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে অনেকেই নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যাচ্ছেন।
তবে এই ঘরমুখো মানুষের যাত্রাকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে সড়কে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। কোথাও যানজট, কোথাও বাস সংকট। এর মধ্যেই পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাসের টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রীকে ট্রাক ও পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে দেখা গেছে।
সকাল থেকে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর, ফুলবাড়িয়া, গেন্ডা, পাকিজা মোড়, রেডিও কলোনি, নবীনগর ও বাইপাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি স্টপেজেই দূরপাল্লার বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন শত শত যাত্রী।
অনেক যাত্রীকে দূরপাল্লার বাসে সিট না পেয়ে লোকাল বাসে ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ বাড়তি ভাড়ার চাপ ও যানবাহনের সংকট উপেক্ষা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা ট্রাক কিংবা পিকআপে করেই রওনা হয়েছেন।
বেলা ১২টার দিকে সাভারের উলাইল বাসস্ট্যান্ডে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন পোশাকশ্রমিক জুয়েল মিয়া। তিনি জানান, গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশ্যে সকাল ১০টা থেকে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। এ সময় দু-একটি বাস এলেও সিট না পেয়ে ফিরতে হয়েছে। ফলে এখনো অপেক্ষায় আছেন তিনি।
রেডিও কলোনি এলাকায় অপেক্ষমাণ যাত্রী আরাফাত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া যাওয়ার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কোনো বাসেই সিট পাচ্ছেন না। আবার যেসব বাস পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোতে সাধারণ সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নবীনগর বাস টার্মিনালে অপেক্ষমাণ পোশাকশ্রমিক তরিকুল ইসলাম বলেন, 'পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশাল যাব। সকালে টার্মিনালে এলেও টিকিট পেয়েছি বিকালের। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি তো তাও টিকিট পেয়েছি। টিকিট না পেয়ে সকাল থেকে অনেক যাত্রীকে দেখেছি কাউন্টার থেকে কাউন্টার ঘোরাঘুরি করতে। কোনো কোনো কাউন্টার বেশি ভাড়াও চাচ্ছে। ঈদের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে রীতিমতো। আবার সকালে রপ্তানি এলাকা থেকে নবীনগর আসতেই ২ ঘণ্টা সময় লেগেছে জ্যামের কারণে।'
বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
সোহেল রানা নামে এক যাত্রী বলেন, দুই ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন কাউন্টারে ঘুরেও এখনো টিকিট পাননি। তার ভাষায়, ৫০০ টাকার ভাড়া ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে।
যদিও নির্বাচন উপলক্ষে যাত্রীর চাপ বেড়েছে—এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, 'কাল আমি অফিসের কয়েকজন ভলেন্টিয়ারকে তুলে দিয়ে আসতে গিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে দুজন চিটাগাং যাচ্ছিলেন। তাদের কাছ থেকে ৮০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়মিত ভাড়া ছিল ৬৮০ টাকা। চিটাগাং রোডে ঈদের সময়ও সাধারণত বেশি ভাড়া নেওয়া হয় না।'
তিনি আরও বলেন, 'সুনামগঞ্জ রোডেও আমি দেখেছি ডাবল ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। যেসব রিমোট এলাকায় যাওয়া হচ্ছে, সেখানে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এর একটি কারণ হতে পারে গাড়ির সংকট। অনেক গাড়ি সরকারি রিকুইজিশনে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে গাড়ির কিছু সংকট রয়েছে। অথচ মানুষের চাহিদা অনেক।'
সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমরা সব সময় এসব বিষয়ে সরকারকে বলে থাকি, কিন্তু সরকার কখনোই কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। আমরা আশা করব, আগামীতে যে সরকার আসবে তারা এই বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে দেখবে।'
এদিকে শ্যামলী পরিবহনের কল্যাণপুর কাউন্টারের ম্যানেজার টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের এখানে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। বরিশালে স্বাভাবিক ভাড়া ৫৫০ টাকা, সেটাই রাখা হচ্ছে। তবে সব টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ট্রিপ যুক্ত করেও চাপ সামাল দিতে পারছি না।'
নবীনগর বাস টার্মিনালের দ্রুতি পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার শহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'অন্যান্য সময় যেখানে ৪টি গাড়ি ছাড়তে পারি, সেখানে আজ গাড়ি পেয়েছি ১টি। বাকি সব বাসই নির্বাচন উপলক্ষে রিকুইজিশন করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গাড়ি কম থাকায় যাত্রীদের হয়রানি হতে হচ্ছে, অনেকেই টিকিট না পেয়ে ঘুরে যাচ্ছেন।'
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এটি সত্য নয়।'
রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার মাস্টার মিজান বলেন, 'সকাল থেকে আমাদের ১১টি ট্রিপ গেছে, যার সবগুলো সিটই ফুল। টার্মিনালে প্রচুর যাত্রীর চাপ রয়েছে।'
জননী, এফ কে ও এনআর পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ওহিদ বলেন, 'বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সঠিক না। আমাদের লাস্ট স্টপেজ পর্যন্ত যেখানে ভাড়া ৯৬০ টাকা, সেখানে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ টাকায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা স্বল্প দূরত্বে যাবে, তাদের কাছে ভাড়া বেশি মনে হতে পারে। তবে কারো কাছ থেকেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে না।'
বাইপাইল এলাকায় চাপাইনবাবগঞ্জগামী যাত্রী ইসমাইল বলেন, 'টেলিভিশনে বলা হচ্ছে নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে, কিন্তু কই সেই নিরাপত্তা। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম, তার ওপর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে। কোনো শৃঙ্খলা নাই।'
আজ সকাল ৮টার দিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে ঢাকার সাভারের বাইপাইল এলাকায় নবীনগর–চন্দ্রা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন নির্বাচনের ছুটিতে ঘরমুখো সাধারণ যাত্রীরা। পরবর্তীতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আশুলিয়া থানা পুলিশের আশ্বাসে সড়ক থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন আন্দোলনকারীরা।
রাজশাহী নওগাঁ যাবেন পোশাকশ্রমিক আবুল কালাম সোহাগ। তিনি বলেন, 'ভোট দিতে রাজশাহী নওগাঁ যাব। আগে ৫০০ টাকা ভাড়া ছিল, এখন ১ হাজার টাকার বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে।'
জামালপুরের উদ্দেশে যাত্রা করা মো. মুখলেস নামে আরেকজন বলেন, 'আমি গ্রামের বাড়ি জামালপুরে যাব। ৩০০ টাকার ভাড়া এখন ১ হাজার টাকা চাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান চাই।'
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, যাত্রীদের অভিযোগ শোনার পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে সরে যান। সড়কে এখন যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এ বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শাহজাহান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সড়কে প্রচুর যানবাহনের চাপ রয়েছে, তবে কোথাও গাড়ি থেমে নেই, চলমান। চন্দ্রার দিকে কিছুটা জ্যাম রয়েছে। একসঙ্গে যাত্রীদের চাপ তৈরি হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের পুলিশের অধিকাংশ লোকবলই নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত বা নিয়োজিত। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে আশা করছি, শিগগিরই সড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।'
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে সেভাবে কোনো অভিযোগ আসছে না। অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
আগাম ছুটিতে ভোট দিতে বাড়ি ফিরছেন পোশাক শ্রমিকরা
টানা চার দিনের লম্বা ছুটিতে গাজীপুরের কয়েক লাখ পোশাক শ্রমিক বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভোট দিতে নাড়ির টানে তারা ছুটছেন গ্রামের দিকে। ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যেন তৈরি হয়েছে ঈদের সময় বাড়ি ফেরার মতো আমেজ, সেই সঙ্গে বাড়ছে ভোগান্তিও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার বিকেলে কারখানা ছুটির পর বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে রওনা হওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে থেমে থেমে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে, যা চরম দুর্ভোগে ফেলেছে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের। পোশাক শ্রমিকদের পাশাপাশি মৌসুমি কৃষি শ্রমিকরাও ভোট দিতে বাড়ি ফিরছেন।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্টেশনে হাজারো যাত্রী অপেক্ষমাণ। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে চন্দ্রা থেকে বাড়ইপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। সকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও যাত্রীর চাপ কমেনি।
ভোট উৎসবে শামিল হতে উন্মুখ শ্রমিকরা জানান, যানজট ও যানবাহন সংকট তাদের যাত্রাপথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টাঙ্গাইলগামী পোশাক শ্রমিক ফরহাদ হোসেন বলেন, 'ভোট দিতে সকালে রওনা হয়েছি। কিন্তু চন্দ্রা মোড়েই এক ঘণ্টা আটকে আছি। কখন পৌঁছাব জানি না।'
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'হাইওয়ে পুলিশের ৮০ শতাংশেরও বেশি সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করছেন। যার কারণে খুবই কম সংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে আমরা মহাসড়কগুলো নিয়ন্ত্রণ করছি। এখন আমরা জেলা পুলিশকে বলে দিয়েছি সমন্বয় করে মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি দায়িত্ব শেষে হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা ফিরে এলে আমরা যথারীতি কাজ করতে পারবো।'
মহাসড়কে যানজটের বিষয়ে তিনি বলেন, 'গতকাল গার্মেন্টস ছুটি হওয়ায় সবাই একসাথে ভোট দিতে গ্রামে যাচ্ছে। তাদের নেয়ার জন্য বাসগুলো বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়ানোয় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রাত ৩টা থেকে আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত চাপ ছিল। এখন কিছুটা কমেছে। আগামী দুই-তিন দিন একটু সমস্যা হবে। এরপর ঠিক হয়ে যাবে।'
