ভারতে এবার ‘চীনা’ ট্যাগ দিয়ে ত্রিপুরার যুবককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা
উত্তর ভারতের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন ভারতের ত্রিপুরার আঞ্জেল চাকমা। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরির নিয়োগপত্রও পেয়েছিলেন।
কিন্তু গত ৯ ডিসেম্বর সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ২৪ বছর বয়সি আঞ্জেল সেদিন তার ছোট ভাই মাইকেলের (২১) সঙ্গে দেরাদুনের রাস্তায় বেরিয়েছিলেন। সেখানে দুই কিশোরসহ ছয়জনের একটি দলের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়, যা দ্রুতই বর্ণবিদ্বেষী হামলায় রূপ নেয়। হামলাকারীরা দুই ভাইকে 'চীনা' ও 'মোমো' বলে বিদ্রুপ করে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে আঞ্জেলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে, তবে একজন এখনো পলাতক।
উত্তরাখণ্ড ত্রিপুরা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ক্বথার দেববর্মা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'হামলাকারীদের সাথে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তারা ছেলেদের "মোমো" ও "চীনা" বলে গালি দিতে থাকে। আঞ্জেল তাদের বারবার বলছিলেন, তারা ত্রিপুরার বাসিন্দা এবং ভারতীয়, কিন্তু হামলাকারীরা থামেনি। তারা ক্রমাগত বিদ্রুপ করে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে দুই ভাই সেখান থেকে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। আঞ্জেল তার মোটরসাইকেলটি চালুও করেছিলেন, কিন্তু তখনই হামলাকারীরা মাইকেলের মাথায় আঘাত করে। আঞ্জেল মোটরসাইকেল থেকে নেমে বাধা দিতে গেলে অভিযুক্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে।'
পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে মাইকেল উল্লেখ করেছেন, হামলার আগে তাদের উদ্দেশ্যে বর্ণবিদ্বেষী গালি দেওয়া হয়। দেববর্মা জানান, 'আঞ্জেলের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। মনে হচ্ছিল তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়।' হামলার ১৭ দিন পর ২৬ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
পুলিশের তথ্যমতে, গত ৯ ডিসেম্বর একটি ক্যান্টিনে ৫-৬ জনের সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ২৪ বছর বয়সি আঞ্জেলের মাথায় ও পিঠে ধারালো অস্ত্র এবং 'কড়া' (ধাতব ব্রেসলেট) দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
হামলার পরদিন ১০ ডিসেম্বর অভিযোগ জানানো হলেও পুলিশ ১২ ডিসেম্বরের আগে এফআইআর নথিভুক্ত করেনি। আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় ১৪ ডিসেম্বর। পুলিশের এ বিলম্বের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে এনেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
আঞ্জেল ত্রিপুরার উনকোটি জেলার বাসিন্দা ছিলেন। খেলাধুলার সামগ্রী উৎপাদনকারী একটি বিখ্যাত ফরাসি বহুজাতিক কোম্পানিতে তার কর্মজীবন শুরু করার কথা ছিল।
আঞ্জেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বিক্ষোভকারীরা রাজপথে নেমে এসে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আঞ্জেলের চাচা মোমেন চাকমা বলেন, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় এই সন্তানকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। তিনি বলেন, 'সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। ওদের পরিবার খুব একটা সচ্ছল নয়; ত্রিপুরার অন্য দশটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই তারা। উত্তরাখণ্ডে এমবিএ পড়ার জন্য আঞ্জেল শিক্ষা ঋণ নিয়েছিল। গত ১০ ডিসেম্বর তার চূড়ান্ত সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার ঠিক এক দিন আগেই একদল মানুষ তার ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়।'
আঞ্জেলের বাবা তরুণ প্রসাদ চাকমা বর্তমানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর হেড কনস্টেবল। বর্তমানে তিনি মণিপুরে কর্মরত। তার বরাত দিয়ে পিটিআই জানায়, পুলিশ শুরুতে এই ঘটনায় মামলা নিতে রাজি হয়নি। পরে অল ইন্ডিয়া চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে ঘটনার দুই-তিন দিন পর এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়। আঞ্জেলের চাচা মোমেনও দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে পুলিশের এই গড়িমসির বিষয়টি তুলে ধরেন।
বড় ছেলেকে হারিয়ে মা গৌরীমিতা চাকমা এখন এতটাই আতঙ্কিত যে তার আরেক ছেলে মাইকেলকে আর উত্তরাখণ্ডে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না।
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা এ বিষয়ে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে কথা বলেছেন। মানিক সাহা বলেন, 'উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।'
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তরুণ চাকমা বলেন, সেদিন আঞ্জেল ও তার ভাই মাইকেল বাজারে গিয়েছিলেন। এমন সময় একটি স্কুটার ও একটি মোটরসাইকেলে আসা ছয়জন ব্যক্তি তাদের পাশে থামে। আঞ্জেল তার মোটরসাইকেলে বসে ছিলেন, পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মাইকেল। অভিযুক্তরা হঠাৎ মাইকেলকে কিছু একটা বলে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। আঞ্জেল এর প্রতিবাদ করলে তারা গালিগালাজ শুরু করে এবং "চীনা" ও "মোমো"সহ নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। এরপরই তারা আঞ্জেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার ঘাড় ও পিঠে মারাত্মক জখম করে।
এদিকে দেরাদুনের এসএসপি অজয় সিং সাংবাদিকদের বলেন, ওই ছয়জনের দলটি নিজেদের মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে তর্ক করছিল। আঞ্জেলের মনে হয়েছিল তারা হয়তো তাকে লক্ষ্য করে কিছু বলছে। এই ভুল বোঝাবুঝি থেকেই ঝগড়ার সূত্রপাত হয় এবং আঞ্জেলের ওপর হামলা চালানো হয়।
