স্মরণ: সুকুমার রায়
১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুকুমার আবার দেশের মাটিতে পা রাখলেন। কিন্তু তার দেশে পা রাখার (২৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯১৩) কয়েক মাস আগেই (১৩ই মে, ১৯১৩) বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ঘটে গেছে। উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায় আবির্ভাব হয়েছে 'সন্দেশ' পত্রিকার। কেমন ছিল সেই 'সন্দেশ'?
প্রথম থেকেই প্রতি মাসে প্রথম পৃষ্ঠার বাঁ দিকে থাকত একটি রঙিন পূর্ণ পৃষ্ঠা চিত্র (ফ্রন্টিস-পিস)। তাছাড়া বড়ো বড়ো হাফটোন ছবি, ফটো আর অজস্র অনবদ্য রেখা-চিত্র প্রতিটি লেখাকে বিচিত্রিত করত। উল্লেখযোগ্য ছিল বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য। পৌরাণিক কাহিনী, দেশ-বিদেশের উপকথা, রূপকথা, মৌলিক গল্প, ছড়া, কবিতা, গান, গানের স্বরলিপি ছাড়াও থাকত ধাঁধা, হেঁয়ালি, দেশ-বিদেশের খবর, ঐতিহাসিক আর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, জীবজন্তুর কাহিনী, আবিষ্কার ও অভিযানের কথা—সরস লেখা ও ছবিতে তথ্য সমৃদ্ধ প্রবন্ধও গল্পের মত চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠত।
প্রথম দিকে সব ক'টি গল্প-প্রবন্ধ ও ছবি উপেন্দ্রকিশোর নিজে লিখতেন ও আঁকতেন। পরবর্তীকালে অনেক গুণী লেখক এগিয়ে আসেন। ১৩২০-এর শ্রাবণ সংখ্যায় সন্দেশ-এ সুকুমারের আবির্ভাব ঘটে। তবে লেখক হিসেবে নয়, চিত্রকর হিসেবে। কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়ের হাসির গল্প 'ভবম হাজাম' এর ততোধিক মজার এক পাতাজোড়া ইলাস্ট্রেশন করেন সুকুমার। শিংওয়ালা রাজার মুখের অপ্রস্তুতভাব আর কাঁচি হাতে ভবম হাজামের মুখের বিস্ময় কি সুন্দর ভাবেই না ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
দেশে ফিরেই 'সন্দেশ'-এ সুকুমারের গল্প, কবিতা, ছড়াগুলি পাঠকদের অদ্ভুত আমোদে ভরিয়ে দেয়। প্রথম দিকে 'সন্দেশ'-এ লেখা আঁকার কাজ ছাড়াও প্রুফ দেখার মত কষ্টকর কাজটি সুকুমার করতেন। 'সন্দেশ' সম্পাদনার পথে এই ছিল তার প্রথম ধাপ। উপেন্দ্রকিশোর স্বচেষ্টায় মুদ্রণশিল্পের এক বিশেষজ্ঞ হয়েছিলেন আর সুকুমার বিলেতে গিয়ে সেরা সব জায়গা থেকে ছবি ছাপার যাবতীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য আয়ত্ত করে আসেন। ফলে এই দুই বিশেষজ্ঞের পরিচালনায় এই পর্যায়ের 'সন্দেশ' দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজের অন্যতম বলে স্বীকৃত হয়েছিল।
১৯১৫ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে ডায়বেটিস রোগে উপেন্দ্রকিশোর ইহলোক ত্যাগ করলে সুকুমার সম্পাদকের আসনে আসীন হন। সম্পাদনার ভার নিয়ে সুকুমার উপেন্দ্রকিশোরের সময়কার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই রক্ষা করেছিলেন। উপরন্তু 'সন্দেশ'-কে আরও চিত্তাকর্ষক করে তুলেছিলেন।
পর্যায়ক্রমে পুরানো সংখ্যাগুলি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় উপেন্দ্রকিশোর যে-বয়সের পাঠকদের কথা চিন্তা করতেন তারা বড়জোর ১০/১২ বছরের বালক। কিন্তু সুকুমারের সম্পাদনায় ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের পাঠ্য যথেষ্ট থাকলেও, ১৫/১৬ বছরের পাঠকরাও যথেষ্ট চিন্তার খোরাক পেত। অর্থাৎ, শিশুতোষ সন্দেশের চরিত্র বদল হয়ে আস্তে আস্তে তা কিশোর পাঠ্য হয়ে ওঠে। এই সময়ের সন্দেশকে 'সুকুমারের সন্দেশ' বললেও ভুল হয় না।
উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পরও তার অপ্রকাশিত কিছু ছবি, গল্প, গান 'সন্দেশ'-এ প্রকাশিত হয়। 'পুরাতন লেখা' নাম দিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধও ছাপা হয়েছিল। সুকুমারের সম্পাদনায় রায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও সমান তালে পত্রিকার জন্য লিখতে থাকেন। কাকা কুলদারঞ্জন লিখতেন পৌরাণিক কাহিনি, দেশ বিদেশের উপকথা আর বিখ্যাত বিদেশী গল্পের অনুবাদ, ছোটকাকা প্রমদারঞ্জন (ইনি লেখিকা লীলা মজুমদারের বাবা) ব্রহ্মদেশ সীমান্তের দুর্গম অঞ্চল থেকে প্রত্যক্ষ-অভিজ্ঞতালব্ধ রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে লিখতেন 'বনের খবর'। দিদি সুখলতা সরস গল্প-কবিতা লিখে আর ছবি এঁকে পাঠাতেন।
মেজদিদি পূণ্যলতা লিখতেন মৌলিক আর অনুবাদ গল্প আর গাছপালা বিষয়ে সরস প্রবন্ধ। মেজো ভাই সুবিনয়ের দক্ষতা ছিল বহুমুখী। একাধারে চমৎকার হাসি ও রহস্য গল্প লেখার পাশাপাশি লিখতেন সরস বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, হেঁয়ালি আর ধাঁধা। ছোটো ভাই সুবিমল মজার গল্প আর তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখতেন।
এমন কি ছোটবোন শান্তিলতাও তার স্বল্পায়ু জীবনের মধ্যেই 'সন্দেশ'-এর জন্য বেশ কয়েকটি ভারি সরস কবিতা লিখেছিলেন। দিদিমার ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু 'মেজদাদামশাই' নাম নিয়ে রাক্ষুসে মাকড়সা, উই, তেঁতুল বিছে, কাঁকড়া বিছে থেকে শুরু করে ধারাবাহিক প্রবন্ধে 'আমাদের শরীরের কথা' লেখেন।
তবে সুকুমার রায় সম্পাদিত 'সন্দেশ' কিন্তু শুধুমাত্র 'পারিবারিক পত্রিকা'-র নিগড়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বহু বিখ্যাত ও গুণী লেখকরা নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, প্রিয়ংবদা দেবী, যোগীন্দ্রনাথ সরকার আর বিজয়চন্দ্র মজুমদার তো প্রথম থেকে লিখতেনই- এবার তার সাথে যুক্ত হল সীতা দেবী, শিবনাথ শাস্ত্রী, কালিদাস রায়, প্রমথ চৌধুরী, অতুল প্রসাদ সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম। সুনির্মল বসুর মত অনেকেই আগে 'সন্দেশ'-এ লিখে হাত পাকিয়ে পরে বিখ্যাত হয়েছেন।
সন্দেশের শুরু থেকেই ছবি ছিল পত্রিকাটির অনন্য সম্পদ। সুকুমারের হাতে পড়ে তা আরও বহুবর্ণছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। কী অসাধারণ সব প্রচ্ছদ! মেঘের কোলে রামধনুর মাঝে পৃথিবীর উপর বসা বালক বালিকাদের সন্দেশ পাঠ, রঙিন পর্দা ছিঁড়ে বের হয়েছে হাসি হাসি মুখের একটি মেয়ে; এক হাতে 'সন্দেশ' পত্রিকার বান্ডিল আর অন্য হাতে হাঁড়ি ভর্তি 'সন্দেশ' নিয়ে হাসিমুখের এক বুড়ো দাদু; থালা ভরা সন্দেশের সামনে বসে থাকা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা।
শুধু প্রচ্ছদই নয় ভিতরের ইলাস্ট্রেশনেও সুকুমারের 'সন্দেশ'-এ গুরুত্ব পেয়েছিল বিভিন্ন পশুপাখি, জীবজন্তু, আর প্রাকৃতিক ঘটনার চিত্তাকর্ষক ছবি, আর রঙিন ফটো। এগুলি অনেক সময় প্রথম পাতাতেই ছাপা হত। সমুদ্রের ফুল, বিচিত্র বর্ণের শঙ্খ, সমুদ্রের তলায় আশ্চর্য বাগান, উজ্জ্বল বিচিত্র বর্ণের প্রজাপতি, শুক পাখি, সূর্যের পূর্ণ গ্রহণ, ক্রাকাতোয়ার অগ্নিকাণ্ড—এসবের দারুণ সব রঙিন ছবি সন্দেশ-এ বের হত। দেখেই তরুণ মন প্রবন্ধটির প্রতি আকৃষ্ট হত। তৎকালীন যুগে নামী বিলাতি পত্রিকা ছাড়া এমন ছবি দেখা যেত না। উপেন্দ্রকিশোরের মত সুকুমারও নিজের লেখা ছাড়া অন্যদের গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের সঙ্গেও ছবি আঁকতেন। সুন্দর আর মজার বিলেতি ফটো ছাপাতেন। সঙ্গে কয়েকটি লাইনে মজার ছড়াও জুড়ে দিতেন। দু-একটা উদাহরণ দিই—
চকিতে তাকানো বিড়ালের ফটোগ্রাফের তলায় লেখা, 'ইঁদুর নাকি?' বৈশাখ, ১৩৩০ সংখ্যায় পাতা জোড়া সেই রঙিন ছবির কথাই বা ভুলি কেমন করে? দুটি শিশু, মুখ ভরা মিষ্টি, সামনে মিঠায়ের ঝুড়ি, পিছনের পর্দার থেকে দুটি হাত বেরিয়ে তাদের দুটি কান ধরা, হাতের মালিককে দেখা যাচ্ছে না। তলায় লেখা, 'পটলা ন্যাপা ব্যস্ত দুজন টপ্টপাটপ মিঠাই ভোজে / হঠাৎ দেখে কার দুটো হাত এগিয়ে তাদের কানটি খোঁজে'। অথবা বাথটবে আসীন শিশু, পাশ থেকে উঁকি মারছে এক রামছাগলের মুখ। নীচে অনবদ্য ক্যাপশান, 'ও পিসী গ! হাবল কাকা / দৌড়ে এস তোমরা সবে- / এই দেখ না দুষ্টু ছাগল, / নাইতে চাছে আমার টবে'।
এই সময় সুকুমারের সাহিত্যকর্মও তার চূড়ান্ত সীমায় পদার্পণ করে। দ্বিতীয় শ্রেণীর লেখা একটিও পাওয়া যাবে না। প্রায় সব কটি মৌলিক কবিতা, মৌলিক গল্প, দেশ বিদেশের উপকথা, জীবনী, সে-কালের ও এ-কালের নানা ঐতিহাসিক ঘটনা, জীবজগতের বিবিধ তথ্য, গোটা আষ্টেক নাটক, দুটি বড়ো গল্প (যার মধ্যে একটি, হযবরল; অবশ্য লুইস ক্যারলের অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড দ্বারা প্রভাবিত) নিয়ে সুকুমার যেন নব নব রূপে মেলে ধরলেন নিজেকে। ১৩২১-এর মাঘ সংখ্যায় প্রথম 'আবোলতাবোল'-এর কবিতা সচিত্র 'খিচুড়ি' প্রকাশিত হয়। পরবর্তী নয় বছরে মোট ১০৩টি কবিতা, ৮৮টি ছোট গল্প, ১২২টি প্রবন্ধ লিখেছেন সুকুমার 'সন্দেশ'-এর জন্য। সব ছবি তার আঁকা। প্রায় সব ফটো তার তোলা।
এর সঙ্গে ছিল ছাপাখানার দিনব্যাপী পরিশ্রম আর প্রুফ দেখার খাটুনি। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল ছোটদের জন্য চুটকী, ধাঁধা, হেঁয়ালি বানানো। যা একই সঙ্গে ছোটদের আনন্দ দিত, কৌতূহল জাগাতো, বিচার করতে, বুদ্ধি খাটাতে আর কল্পনা শক্তি প্রয়োগ করতে শেখাত।
সুকুমারের অনবদ্য সরস ভাষায় লেখা, ফটো ও ছবিসহ ডেভিড লিভিংস্টোন, ক্রিস্টোফার কলম্বাস, লুই পাস্তুর, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, সক্রেটিস, আর্কিমিডিস, দানবীর কার্নেগী আরও কতজনের কথা 'সন্দেশ'-এর পাঠকরা পড়েছে। সর্বমোট ১৬টি জীবনীর কোনটিতেই জ্ঞান দেবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা দেখা যায় না। তবে জীবজন্তু বিষয়ক ৩৭টি রচনায় সুকুমার যেন নিজেকেও ছাপিয়ে যান। ১৩২১ থেকে ১৩৩০-এর মধ্যে সন্দেশে প্রকাশিত এই নিবন্ধগুলির মেজাজ আজ পর্যন্ত অন্য কোন লেখকের লেখায় দুর্লভ। প্রকাশিত শেষ নিবন্ধটি 'মানুষমুখো'। তার আরম্ভটা পড়লেই মেজাজটা সম্যক রূপে বোঝা যাবে—'বাঁদরের মুখের চেহারা যে অনেকটা মানুষের মত তা দেখলেই বোঝা যায়। ..... কোনো কোনো বাঁদর আছে তাদের মাথার লোমগুলি দেখলে ঠিক টেরি কাটা মানুষের মাথার মতো মনে হয়, যেন কেউ চিরুনী দিয়ে চুল ফিরিয়ে সিঁথে কেটে দিয়েছে....।' ছেলেমেয়েদের যথার্থ প্রকৃতি পড়ুয়া করে তুলতে এদের জুড়ি নেই।
কেবলমাত্র প্রকৃতি নয়, লুপ্ত শহর পম্পেই, চীনের প্রাচীর, মিশরের পিরামিড, মরু বিজয়, মেরু অভিযান, আদ্যিকালের গাড়ির কথা, লাইব্রেরির ইতিকথা এমনি কত সব। এমন কী সাম্প্রতিক কালে পৃথিবীর যেখানে যা উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটত, সুকুমার তাকেই 'সন্দেশ'-এর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতেন। মার্কিন রকেট ছোঁড়ার খবর জানাতে লিখলেন 'চাঁদমারি', বেতার বোঝাতে, 'আকাশবাণীর কল', হাফটোন ছাপার পদ্ধতি, পাতাল রেল সম্পর্কে লিখলেন, 'ভুঁইফোড়'। তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কৃত হবার অল্পদিনের মধ্যেই সন্দেশীরা তার খবর জানল। জানল ক্রাকাতোয়ার অগ্নিকাণ্ড, সূর্যের পূর্ণ গ্রহণ এমন কত কি!
আসলে সম্পাদক সুকুমার সর্বদাই চাইতেন যেন প্রাচীন ও অর্বাচীনের সমন্বয়ে এক অনন্য পত্রিকা হয়ে উঠুক 'সন্দেশ'। নলিনী দাশ লিখেছেন, 'সন্দেশ-ই যেন লেখক ও সম্পাদক সুকুমার রায়কে পূর্ণবিকশিত হবার সুযোগ আর প্রেরণা দিয়েছে। যে কয়বছর সুকুমার রায় 'সন্দেশ' সম্পাদনা করেছিলেন, সেটাই তাঁর জীবনে সাহিত্যসৃষ্টির সেরা সময়। প্রায় সব লেখাই ছোটদের জন্য। প্রায় সবই 'সন্দেশ'-এর জন্য। ... রোগ শয্যায় শুয়ে তিনি সন্দেশ সম্পাদনার খুঁটিনাটি কাজ করেছেন, নির্দেশ দিয়েছেন।'
অর্থাৎ যে শিশু সাহিত্যিক সুকুমার আজ বিশ্বনন্দিত, তাকে গঠন করেছে 'সন্দেশ'-ই। সুকুমারের সম্পাদক সত্ত্বা তার লেখক সত্ত্বাকে প্রাণিত করেছে তথাকথিত সিরিয়াস লেখার পরিবর্তে শিশু-কিশোরদের উপযোগী লেখায়। তার সর্বশ্রেষ্ঠ বেশ কয়েকটি লেখা রচিত হয় অন্তিম রোগশয্যায় শুয়ে; যেমন—'হ-য-ব-র-ল' বা 'হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রি'। অন্য লেখকদের রচনা প্রকাশেও সুকুমার তার মুনশীয়ানার পরিচয় দেন। পরবর্তী কালে যারা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বলে গণ্য হবে, এমন সব রচনা প্রকাশিত হয় সুকুমারের সন্দেশ-এর পাতায়। বের হয়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'পাল্কীর গান', অতুলপ্রসাদ সেনের 'বাতাসের গান', রবীন্দ্রনাথের 'সময়-হারা', অবনীন্দ্রনাথের 'খাজাঞ্চির খাতা', সীতা দেবীর 'নিরেট গুরুর কাহিনী' বা কার্লো কলিডির 'পিনোকিও' অবলম্বনে প্রিয়ংবদা দেবীর 'পঞ্চুলাল'।
এই সন্দেশ পত্রিকার ফাল্গুন, ১৩২১ সনের সংখ্যায় সুকুমার প্রথমবার আবোল তাবোল নামে একটি কবিতা লিখলেন। এই সিরিজে এটিই ছিল প্রথম কবিতা (খিচুড়ি নয়)।
এই কবিতার সঙ্গে ছিল হাঁড়ি নিয়ে এক বুড়োর হাফটোন ছবি। এর পরের সংখ্যাগুলোতে তিনি আবোলতাবোল নামেই আরও আটটি ছড়া লেখেন (হেড অফিসের বড়বাবু, কল করেছেন আজব রকম, ওই আমাদের পাগলা জগাই,কুমড়ো পটাশ, শেখবার আছে কত, এক যে ছিল রাজা, হুঁকোমুখো হ্যাংলা আর ছুটছে মোটর ঘটর ঘটর)....
আসলে আবোল তাবোল-কে একটা ব্র্যান্ড নেম করে তুলেছিলেন তিনি। পরে বই যখন হল, তখন সব ছবি নতুন করে এঁকে আর সব কবিতা শুধরে বইয়ের জন্য তৈরি করেন। তাতে প্রতি কবিতার আলাদা আলাদা নাম হয় আর কাঠবুড়ো প্রথমবার তাঁর নাম পান।
হ য ব র ল বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। আবোল তাবোল বইটির সঙ্গে হ য ব র ল বইটিরও পরিকল্পনা সুকুমার রায় করে গিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর আগে। এবং বইয়ের মাপ মতো একটি রঙিন ছবিও এঁকেছিলেন। হ য ব র ল নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় নীলিমা গুহ ঠাকুরতা ও দিলীপকুমার গুপ্ত ওরফে ডি.কে-র প্রকাশন সংস্থা সিগনেট প্রেস থেকে ১৯৪৫ সালে। ডি.কে ও সুকুমার পুত্র সত্যজিৎ রায়ের পরিকল্পনায় বইটির চেহারা আমূল বদলে দেওয়া হয়। লম্বাটে সাইজের পরিবর্তে ছোট মাপের রূপ নেয় বইটি। এবং সুকুমারের ৮টি ছবির সঙ্গে সত্যজিতের আঁকা আরও ১৩টি চিত্রন যুক্ত হয়। প্রচ্ছদ এবং প্রথম সংস্করণের সুকুমার অঙ্কিত রঙিন বিচারসভার ছবিটিও বাদ যায়।
মজার ব্যাপার যে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড কে অবলম্বন করে হ য ব র ল লিখেছিলেন সুকুমার, তাঁর ফ্রন্টিস্পিসেও দেখতে পাই সেই বিচারের দৃশ্য। তবে চরিত্রের সংখ্যা সুকুমারে অনেক কম। কালো ঝোল্লা-পরা হুতোমপ্যাঁচা, মস্ত ছুঁচো, শামলা পরা কুমির আর শেয়াল, ফোঁৎফোঁৎ করে কাঁদা সজারু। সেখানে টেনিয়েলের আঁকা দৃশ্যে চরিত্র অনেক বেশি। ক্যারলের ভাষায় 'The King and Queen of Hearts were seated on their throne when they arrived, with a great crowd assembled about them--all sorts of little birds and beasts, as well as the whole pack of cards: the Knave was standing before them, in chains, with a soldier on each side to guard him; and near the King was the White Rabbit, with a trumpet in one hand, and a scroll of parchment in the other. In the very middle of the court was a table, with a large dish of tarts upon it: they looked so good, that it made Alice quite hungry to look at them--`I wish they'd get the trial done,' she thought, `and hand round the refreshments!' But there seemed to be no chance of this, so she began looking at everything about her, to pass away the time.'
কিন্তু বিচার চলতে চলতে বোঝা যায়, দুটোই আসলে বিচারের নামে প্রহসন। এক জায়গায় ন্যাড়া সাক্ষী ও অন্য জায়গায় ম্যাড হ্যাটার। এদিকে কোবতে বলা হয়—
একের পিঠে দুই
সান্ বাঁধানো ভুঁই
গোলাপ চাঁপা জুঁই
চৌকি চেপে শুই
গোবর জলে ধুই
ইলিশ মাগুর রুই
পোটলা বেধে থুই
কাঁদিস কেন তুই।
হিন্চে পালং পুঁই
তো অন্যদিকে নালিশ করা হয় এই ভাষায়…
'The Queen of Hearts, she made some tarts,
All on a summer day:
The Knave of Hearts, he stole those tarts,
And took them quite away!'
এরপরে অ্যালিসেও রাণীর সঙ্গে বেজায় গোল বাধল অ্যালিসের।
'Hold your tongue!' said the Queen, turning purple.
'I won't!' said Alice.
'Off with her head!' the Queen shouted at the top of her voice. Nobody moved.
'Who cares for you?' said Alice, (she had grown to her full size by this time.) 'You're nothing but a pack of cards!'
আর সব তাস মিলে অ্যালিসকে আক্রমণ করতে এল। অ্যালিসের ঘুমও ভাঙল। সুকুমারেও দেখি, হুকুম হল—নেড়ার তিনমাস জেল আর সাতদিনের ফাঁসি। আমি সবে ভাবছি এরকম অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আপত্তি করা উচিত, এমন সময় ছাগলটা হঠাৎ 'ব্যা-করণ শিং' বলে পিছন থেকে তেড়ে এসে আমায় এক ঢুঁ মারল, তার পরেই আমার কান কামড়ে দিল। অমনি চারদিকে কিরকম সব ঘুলিয়ে যেতে লাগল, ছাগলটার মুখটা ক্ৰমে বদলিয়ে শেষটায় ঠিক মেজোমামার মতো হয়ে গেল। তখন ঠাওর করে দেখলাম, মেজোমামা আমার কান ধরে বলছেন, 'ব্যাকরণ শিখবার নাম করে বুঝি পড়ে-পড়ে ঘুমোনো হচ্ছে ?'
মানে চরম এক ক্যাওসের মধ্যে দিয়ে দুজনেরই ঘুম ভাঙল। মজার ব্যাপার কাহিনীর শেষে ক্যারল যে সুরটা বেঁধে দেন, সুকুমারেও সেই সুর অক্ষুণ্ণ থাকে। ক্যারল লেখেন , 'The long grass rustled at her feet as the White Rabbit hurried by--the frightened Mouse splashed his way through the neighbouring pool--she could hear the rattle of the teacups as the March Hare and his friends shared their never-ending meal, and the shrill voice of the Queen ordering off her unfortunate guests to execution--once more the pig-baby was sneezing on the Duchess's knee, while plates and dishes crashed around it--once more the shriek of the Gryphon, the squeaking of the Lizard's slate-pencil, and the choking of the suppressed guinea-pigs, filled the air, mixed up with the distant sobs of the miserable Mock Turtle..'
সুকুমার শেষ করেন এই বলে, 'আমি তো অবাক! প্রথমে ভাবলাম বুঝি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু, তোমরা বললে বিশ্বাস করবে না, আমার রুমালটা খুঁজতে গিয়ে দেখি কোথাও রুমাল নেই, আর একটা বেড়াল বেড়ার উপর বসে বসে গোঁফে তা দিচ্ছিল, হঠাৎ আমায় দেখতে পেয়েই খচ্মচ্ করে নেমে পালিয়ে গেল। আর ঠিক সেই সময়ে বাগানের পিছন থেকে একটা ছাগল ব্যা করে ডেকে উঠল।'
ভাবানুবাদ বললেও অত্যুক্তি হয় না। আর এভাবেই আমাদের শৈশবকে মিলে মিশে এক করে দিয়ে যান দুই রূপকথার নায়ক....
সব মিলিয়ে আদর্শ ছোটদের পত্রিকা কেমন হওয়া উচিত, তার আদর্শ উদাহরণ ছিল সুকুমার রায় সম্পাদিত 'সন্দেশ'। সুকুমারের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্মল আনন্দের মধ্য দিয়ে ছেলে-মেয়েদের জ্ঞানবুদ্ধি ফুটিয়ে তোলা ও সুকুমার বৃত্তিগুলি বিকশিত করা। আর তা করতে গিয়ে সম্পাদক সুকুমার খুব সজ্ঞানেই চাপা দিয়েছেন তার সিরিয়াস প্রবন্ধলেখক সত্ত্বাটিকে। অন্তঃস্থল থেকে বার করে এনেছেন শিশু সাহিত্যিক সুকুমারকে। প্রবন্ধ লেখক সুকুমার যে অসাধারণ শিশুসাহিত্যও রচনা করতে পারেন, তা একমাত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন সম্পাদক সুকুমার রায়ই। সম্পাদক হিসেবে অন্য নানা কৃতিত্বের মাঝে সব চেয়ে বড় কৃতিত্ব তার বোধ করি এই টাই।
