সমুদ্রতলের বৃহত্তম ধাতব মজুতে ১১ হাজারের বেশি নতুন ভাইরাসের সন্ধান পেলেন চীনের গবেষকরা
মেক্সিকো ও হাওয়াইয়ের মধ্যবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ধাতব খনিজের বিশাল মজুত রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরে থাকা এসব খনিজ অনুসন্ধান করতে গিয়ে চীনা গবেষকেরা ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬৬২টি ভাইরাসই আগে কখনো শনাক্ত হয়নি।
সমুদ্রের তলদেশে আলুর মতো আকৃতির কোটি কোটি ধাতব পিণ্ড ছড়িয়ে রয়েছে। ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলে থাকা এসব পিণ্ডে নিকেল, কোবাল্ট ও ম্যাঙ্গানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলে এসব ধাতুর মজুত স্থলভাগে থাকা মোট পরিচিত মজুতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত সমুদ্রতলের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে খনিজ উত্তোলন শুরু হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষ (আইএসএ) সেখানে খনিজ অনুসন্ধানের জন্য ১৭টি চুক্তি দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চুক্তি রয়েছে চীনের হাতে।
সম্প্রতি চীনা গবেষকদের একটি দল অঞ্চলটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছে। এতে দেখা গেছে, ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলন করতে গিয়ে মূল্যবান ধাতুর পাশাপাশি অসংখ্য অজানা ভাইরাসেরও সন্ধান পেতে পারেন গবেষকেরা।
গবেষকেরা ওই অঞ্চলের সমুদ্রতলের পলির ৬০টি নমুনা পরীক্ষা করে ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬৬২টি, অর্থাৎ ৯৯ শতাংশেরও বেশি ভাইরাস ছিল নতুন আবিষ্কার।
গত মাসের শেষ দিকে 'নেচার কমিউনিকেশনস' সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে প্রধান লেখক হৌ বোওয়েন লিখেছেন, 'এই গবেষণার ফলাফল পলিমেটালিক নডিউলসমৃদ্ধ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে ভাইরাসের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা দেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য খনিজ উত্তোলন শুরুর আগের অণুজীবের বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।'
হৌ বোওয়েন চীনের চংকিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দ্বিতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের যৌথ পিএইচডি শিক্ষার্থী।
গবেষণায় ব্যবহৃত ৬০টি নমুনা ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সংগ্রহ করা হয়। খনিজ অনুসন্ধানের চুক্তি পাওয়া চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ওশান মিনারেল রিসোর্সেস আরঅ্যান্ডডি অ্যাসোসিয়েশন নমুনাগুলো সংগ্রহ করে।
গবেষকেরা প্রোটিনের মিল বিশ্লেষণ করে এসব ভাইরাসের সঙ্গে সমুদ্রের পানি, গভীর সমুদ্রখাত ও সমুদ্রতলের উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকায় আগে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের তথ্য তুলনা করেন।
তুলনায় দেখা যায়, ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলে পাওয়া ভাইরাসগুলোর প্রোটিন গুচ্ছের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশের সঙ্গে বাইরের অন্তত একটি তথ্যভান্ডারে থাকা ভাইরাসের প্রোটিনের মিল রয়েছে। অর্থাৎ, এ অঞ্চলে এমন কিছু ভাইরাসের বংশধারা ও জিনগত উপাদান রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না।
গবেষকদের ধারণা, এ অঞ্চলের ব্যতিক্রমী পরিবেশের কারণে ভাইরাসগুলোর বৈশিষ্ট্যও স্বতন্ত্র হতে পারে। এখানকার পরিবেশে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেশি, কিন্তু জীবের ব্যবহারের উপযোগী পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে।
গবেষকেরা যে ভাইরাসগুলো শনাক্ত করেছেন, তার বেশির ভাগই 'কডোভিরিসিটিস' শ্রেণির। এ শ্রেণির ভাইরাসের লেজের মতো একটি গঠন রয়েছে। এর সাহায্যে তারা সিরিঞ্জের মতো ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে নিজেদের জিনগত উপাদান প্রবেশ করাতে পারে। সমুদ্র, স্থলভাগ এমনকি মানুষের অন্ত্রেও এ শ্রেণির ভাইরাসের দেখা মেলে।
এসব ভাইরাস সাধারণত মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। এগুলো মূলত ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ও ধ্বংস করে। বরং মানুষের কর্মকাণ্ডে ভাইরাসগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
সমুদ্রতল থেকে খনিজ উত্তোলনের সময় পলির স্তর নাড়াচাড়া হলে এসব ভাইরাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। অথচ সমুদ্রতলের বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাদের। জৈব পদার্থ ভেঙে ফেলা এবং পরিবেশে পুষ্টি উপাদান ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজ করে ভাইরাসগুলো। খনিজ উত্তোলনের কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে সমুদ্রতলের বাস্তুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
