ট্রাম্পের নারী কর্মীদের বিদায়ের চেনা পথ: স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে পদত্যাগ; গুরুতর অনিয়মের অভিযোগের পরও পদে বহাল পুরুষেরা
ডোনাল্ড ট্রাম্প নারীবাদী নন তিনি নিজেই এ কথা স্বীকার করেন। তবে বছরের পর বছর ধরে তার নীতি ও ব্যক্তিগত আচরণের সমালোচনা এড়াতে প্রেসিডেন্ট প্রায়শই নারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির কথা তুলে ধরেছেন।
তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদে, ট্রাম্প প্রশাসন ছেড়ে যাওয়া বেশিরভাগের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে, তার আটজন উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তার অর্ধেকই হয় পদত্যাগ করেছেন, না হয় বরখাস্ত হয়েছেন। আর তাদের সবার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুরুষরা। এছাড়া তার প্রশাসনের আরও বেশ কয়েকজন নারী স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন।
শুক্রবার ট্রাম্প তার হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ—এবং এই পদে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম নারী সুজি ওয়াইলসকে সরিয়ে দেওয়ার খবর অস্বীকার করতে বাধ্য হন। ট্রাম্প দাবি করেন, 'তিনি দীর্ঘ সময় এখানেই থাকছেন'।
এদিকে, ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ থেকে শুরু করে এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় পুরুষ কর্মকর্তা তীব্র সমালোচনা এবং বারবার পদত্যাগের দাবির মুখেও টিকে গেছেন এবং এখনও তাদের পদে বহাল রয়েছেন।
কেটি যাকারায়া
এই তালিকার সাম্প্রতিকতম নারী ভুক্তভোগী হলেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেটি যাকারায়া , যাকে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় শুক্রবার বরখাস্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার তার প্রথম হোয়াইট হাউস প্রেস ব্রিফিংয়ে চরম ব্যর্থতার মাধ্যমে তার মেয়াদের এক উত্তাল সূচনা ঘটে।
এরপর বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারার কথা স্বীকার করার পর তার আইনি যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাকে। তিনি একজন 'আইনজীবী' নাকি 'আইনজীবী প্রতিনিধি'—এ নিয়ে তৈরি হওয়া শব্দার্থ সংক্রান্ত মারপ্যাঁচ তাকে কঠিন ফাঁদে ফেলে দেয়।
যাকারায়া ক্যারোলিন লিভিটের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। লিভিট আগস্ট মাসে বলেন, তিনি তার ছোট সন্তান ও পরিবারকে আরও বেশি সময় দেওয়ার জন্য ২০ মাস দায়িত্ব পালনের পর স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ক্রিস্টি নোয়েম
বরখাস্তের তালিকায় পতন ঘটা প্রথম শিকার ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম। তিনি ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার অভিযানের প্রধান মুখ ছিলেন, যতক্ষণ না গত ৫ মার্চ তাকে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তার মেয়াদকাল জুড়ে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, যার বড় একটি কারণ ছিল মিনিয়াপোলিসে কেন্দ্রীয় অভিবাসন প্রয়োগকারী অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হওয়া ক্ষোভ (যার মধ্যে একজনকে নোয়েম কোনো প্রমাণ ছাড়াই 'অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী' বলে আখ্যা দেন)। একই সময়ে ট্রাম্পের অভিবাসন এজেন্ডার প্রতি জাতীয় জনসমর্থনেও বড় ধস নামে।
মার্চ মাসে এক কংগ্রেসীয় শুনানিতে তার এক বক্তব্যে তিনি বলেন—ট্রাম্প নাকি অভিবাসীদের 'স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ' করতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২২ কোটি (২২০ মিলিয়ন) ডলারের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার চুক্তিতে তার সম্মতির কথা জানতেন (যে বিজ্ঞাপনে নোয়েমকে ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল)— ট্রাম্পকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছিল।
আর এটিই ছিল ট্রাম্পের ধৈর্যের শেষ সীমা। এছাড়া নোয়েমের অধীনে সার্বিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়েও তীব্র সমালোচনা চলছিল, সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছিল তার উপদেষ্টা কোরি লেওয়ানডোস্কির প্রভাব নিয়েও—যিনি নোয়েমকে সরিয়ে দেওয়ার পর নিজেও পদত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে নোয়েমকে তথাকথিত 'শিল্ড অফ দ্য আমেরিকা' জোটের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত মাসে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বর্তমানে তিনি একটি অস্পষ্ট সংজ্ঞায়িত উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আর স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মার্কওয়েইন মুলিন।
প্যাম বন্ডি
এরপরেই পতন ঘটে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ট্রাম্পের অনুগত প্যাম বন্ডির। ১৪ মাস দায়িত্ব পালনের পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিচার বিভাগের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এপস্টিন সংক্রান্ত ফাইল প্রকাশের বিষয়টি সঠিকভাবে সামলাতে না পারায় প্রেসিডেন্টের মধ্যে তার ওপর ক্রমবর্ধমান বিরক্তি তৈরি হয়েছিল।
এপস্টিন ইস্যুটি ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক দায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তার 'মাগা' সমর্থক ভিত্তিকে ক্ষুব্ধ করেছিল। পাশাপাশি ট্রাম্পের এ ধারণাও তৈরি হয়েছিল, বন্ডি তার রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পদচ্যুত হওয়ার এক মাস পর বন্ডি জানান, তার থাইরয়েড ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে আগস্ট মাসে তার ডেপুটি টড ব্ল্যাঞ্চ অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ গ্রহণ করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের সাথে জেফরি এপস্টিনের অতীত সম্পর্ক এবং তার ব্যক্তিগত দ্বীপে সফরের তথ্য সামনে আসার পর লাটনিকও তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তবে বন্ডির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় লাটনিকের ক্ষেত্রে—ডেমোক্র্যাটরা তার পদত্যাগের দাবি জানালেও হোয়াইট হাউস তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়।
লোরি শ্যাভেজ-ডি রেমার
এপ্রিল মাসেই সাবেক শ্রমমন্ত্রী লোরি শ্যাভেজ-ডি রেমার পদত্যাগ করেন। শ্রম বিভাগের পরিদর্শক প্রধানের এক তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে এক অধীনস্থ কর্মীর সাথে প্রেমঘটিত সম্পর্ক স্থাপন এবং কর্মস্থলে মদ্যপানের অভিযোগও ছিল। তার স্থলাভিষিক্ত হন কিথ সন্ডারলিং।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের বিরুদ্ধেও কর্মস্থলে মদ্যপ অবস্থায় থাকা বা অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এখনও এফবিআই পরিচালকের পদে বহাল রয়েছেন।
তুলসি গ্যাবার্ড
এর ঠিক এক মাস পর, মে মাসে তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের (ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর) পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
দাপ্তরিকভাবে তিনি তার স্বামীর বিরল ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার কথা কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও, বাস্তবে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কারণ, ভেনিজুয়েলা ও ইরানের ওপর ট্রাম্প আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এক উত্তাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্যাবার্ডকে পুরোপুরি একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। অথচ এর আগে তিনি কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।
গ্যাবার্ডের জায়গায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা হয় বিল পাল্টেকে—যিনি গোয়েন্দা সংস্থায় কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের একজন চরম অনুগত ব্যক্তি ছিলেন। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে এই পদে দায়িত্ব পান জে ক্লেটন।
কিম্বার্লি গিলফয়েল
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে, ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিনের ট্রাম্প সমর্থক ও সহযোগী কিংবার্লি গিলফয়েলকে গ্রীসে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ চেয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর তাকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ট্রাম্পের হাতে কিছুটা শাস্তির মুখোমুখি হওয়া একমাত্র শীর্ষ পুরুষ কর্মকর্তা হলেন মাইক ওয়াল্টজ। তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ওয়াল্টজকে গত বছরের মে মাসে বরখাস্ত করা হয়, যখন তিনি ভুলবশত 'সিগন্যাল' অ্যাপের একটি গোপন গ্রুপ চ্যাটে এক সাংবাদিককে যুক্ত করে ফেলেছিলেন; যে চ্যাটে পিট হেগসেথ গোপন যুদ্ধ পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ করেছিলেন।
ওয়াল্টজের ওপর ট্রাম্প এমনিতেই কিছুদিন ধরে অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং ইরানের প্রতি ওয়াল্টজের উগ্র ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে প্রেসিডেন্ট বিরক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। 'সিগন্যালগেট' কেলেঙ্কারি কেবল তার বিদায়ের চূড়ান্ত সিলমোহর দেয়।
তবে তাকে কোনো অস্পষ্ট বা গুরুত্বহীন উপদেষ্টা পদে ছুড়ে ফেলা হয়নি। ওয়াল্টজকে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পদে মনোনীত করা হয়। অন্যদিকে, হেগসেথকে সেই বিতর্ক সহজেই পার করার সুযোগ দেওয়া হয়—এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগসহ পরবর্তী একাধিক বিতর্কের পরও তিনি এখনও নিজ পদে বহাল রয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটরা এই দ্বিমুখী নীতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে, ট্রাম্প কেবল তার প্রশাসনের নারী কর্মকর্তাদেরই বরখাস্ত করছেন বলে মনে হয়—এমনকি যারা তার অনুগত এবং তাদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় স্পষ্টতই কম অযোগ্য, তাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটছে।
ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসওম্যান অ্যালেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ বলেন, 'আপনি যদি ট্রাম্প প্রশাসনের একজন পুরুষ হন, তবে মনে হয় তারা অপকর্মের জন্য পুরস্কৃত করে।'
২০১৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'আমি বলব না যে আমি একজন নারীবাদী। আমি মনে করি তা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আমি নারীদের পক্ষে, আমি পুরুষদের পক্ষে, আমি সবার পক্ষে।'
