ইরান যুদ্ধে অস্ত্রাগারে টান: বিশ্বমঞ্চে ফিকে হচ্ছে আমেরিকার শক্তি
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশলের এক মারাত্মক অন্ধত্ব বা কৌশলগত গলদকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। আর তা হলো—আমেরিকা হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু যুদ্ধে ব্যবহৃত বিপুল সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদের শূন্যতা পূরণ করে তা পুনর্মজুত করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। ওয়াশিংটন অবশ্য এখন তাদের খালি হয়ে যাওয়া অস্ত্রাগার পূর্ণ করার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে; তবে এই হিসাব-নিকাশ যুদ্ধে পা বাড়ানোর আগেই করা উচিত ছিল।
সম্প্রতি পেন্টাগনের গৃহীত বিশাল অঙ্কের আর্থিক চুক্তিগুলোই এই সংকটের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে। গত কয়েক দিনে পেন্টাগন 'স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬' (এসএম-৬) এর উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে প্রতিরক্ষা কোম্পানি–রেথিয়নের সঙ্গে ২৪.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। এর আগে বিমান-বিধবংসী এমর্যাম ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ২০.৭ বিলিয়ন ডলার এবং লকহিড মার্টিনের সাথে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার জন্য ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলারের বিশাল চুক্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই—যুদ্ধের কারণে খালি হয়ে যাওয়া অস্ত্রের বিশাল ঘাটতি পূরণ করা; কিন্তু প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করলেই তো আর রাতারাতি অস্ত্রাগারে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়ে ফিরে আসে না। জটিল ও আধুনিক এসব সমরাস্ত্র উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট সময়ও প্রয়োজন হয়।
যুদ্ধের ময়দানে ইতোমধ্যেই ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর কমান্ডারেরা কিছু কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যে আঘাত হানতে দিচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র অনাবাদী বা ফাঁকা এলাকার দিকে ধেয়ে আসছে— সেগুলোকে ধবংস করতে মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ছুড়ছেন না তারা। যাতে করে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র সত্যিই মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দরকারি ইন্টারসেপ্টর হাতে থাকে।
অথচ টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনের কিছু প্রতিবেদনকে খাটো করে দেখিয়েছেন। যেসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, মার্কিন সমরাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন যে, কিছু কিছু অস্ত্রের মজুত সত্যিই কমে এসেছে।
বিভিন্ন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষণার তথ্যও—উচ্চমানের মার্কিন অস্ত্রের বিপুল ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত করে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট এবং থাড ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যথাক্রমে ৮২৭টি এবং ২৭৮টিরও নিচে নেমে আসে।
অবশ্য অস্ত্রের মজুতের ওপর এই টান পড়ার সূচনা হয়েছিল আরও আগেই। ২০২৫ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে, মার্কিন বাহিনীকে ১৫০টিরও বেশি থাড এবং প্রায় ৮০টি এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধ তীব্র হওয়ার আগেই ওয়াশিংটন এই অস্ত্র পুনঃসরবরাহের সংকট উপলদ্ধি করেছিল। সেই অনুধাবন থেকেই, যুদ্ধের আগে জানুয়ারিতে পেন্টাগন এবং লকহিড মার্টিন থাড ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন বছরে ৯৬টি থেকে বাড়িয়ে ৪০০টিতে উন্নীত করা এবং প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন বছরে প্রায় ৬০০টি থেকে বাড়িয়ে—চলতি দশকের শেষ নাগাদ ২,০০০টিতে উন্নীত করার এক চুক্তি সই করে।
কিন্তু, অস্ত্রের পেছনে বাজেট বরাদ্দ বা অর্থ ব্যয় বাড়ানো সহজ হলেও নতুন কারখানা স্থাপন, দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলা এবং মূল সাপ্লাই চেইন তৈরি করা অতটা দ্রুত সম্ভব নয়। এসব জটিল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য কেবল ম্যানুফ্যাকচারিং লিড টাইম-ই লাগে ২৫ থেকে ৫১ মাস; যার অর্থ এগুলো রাতারাতি তৈরি করে ফেলা সম্ভব নয়। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে প্রকাশ্যে এনেছে, যা প্রধান প্রধান অস্ত্রের তীব্র সংকট তৈরি করেছে।
অবশ্য এটা সত্য যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এখনো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এভাবে দ্রুতগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত খালি হতে থাকলে—তা অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ফ্রন্টে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর প্রতিরোধ শক্তি বা ডিট্যারেন্স দুর্বল করে দেবে। মার্কিন কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) অনুমান করছে যে, ২০২৫ সালের জুন থেকে মার্কিন বাহিনী তাদের হাতে থাকা অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টর মজুতের— অর্ধেক অথবা দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। আর এই মুহূর্তে উৎপাদন বাড়ালেও এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অন্তত ৫ বছর সময় লাগবে।
এই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব ইতিমধ্যেই ইউক্রেনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কিয়েভ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের তীব্র সংকটের কথা জানিয়ে আসছে। গত আগস্টে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ইউক্রেনের হাতে এখন আড়াই গুণ কম ইন্টারসেপ্টর রয়েছে, অথচ রাশিয়া প্রতি মাসে আগের চেয়ে দ্বিগুণ হারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটন তাদের সামরিক অভিযানের স্থায়িত্বকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করে এসেছে, যার খেসারত দিতে গিয়ে অস্ত্রাগার খালি হয়েছে। যেমন ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে দ্রুত জয়ের আশা করেছিল পেন্টাগন, কিন্তু সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে থাকে।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় মার্কিন বাহিনী প্রধান প্রধান অস্ত্রের চরম সংকটে পড়েছিল; যেখানে মাত্র ১,২০০টি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৭০০টি এবং হাজার হাজার স্যাটেলাইট-গাইডেড বোমা ব্যবহার করে ফেলা হয়েছিল। পেন্টাগন তখন তড়িঘড়ি করে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও—উৎপাদনের গতি যুদ্ধের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারেনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-ও অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। ক্ষমতায় আসার আগে তিনি আমেরিকার বিগত দিনের "অনন্ত যুদ্ধ"-গুলো (ফরেভার ওয়ার) বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই ওয়াদা রক্ষা না করে তিনি ইরান যুদ্ধ শুরু করেন এবং এই যুদ্ধে তিনি দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয়ের আশা করছেন। শুরুতে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরান যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে, কিন্তু দেখতে দেখতে তা এখন ৮ মাসে পা দিয়েছে।
যুদ্ধে পা দেওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সংকটের কথা জানতো না—ওয়াশিংটন এমন দাবি করতে পারবে না। সুনির্দিষ্টভাবে কেবল ইন্টারসেপ্টরের ক্ষেত্রে নয়, অন্তত ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতের স্থবিরতা এবং অপর্যাপ্ত গোলাবারুদের মজুত সম্পর্কে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। বলা হয়েছিল যে, ওয়াশিংটন যেন যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে না থাকে।
কিন্তু পেন্টাগন কেবল চলতি বছরের শুরুর দিকে 'প্যাক-৩' এবং 'থাড' ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বলা বাহুল্য, একটি যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তা হুবহু না জেনেও আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল।
তবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের প্রভাব যেভাবে মার্কিন সমরাস্ত্রের ওপর পড়ছে এবং তা পুনর্গঠনে যে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন—তা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সামরিক দাপট ও প্রভাবকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ওয়াশিংটনকে বৈশ্বিক মিত্রদের কাছে এক কম শক্তিশালী ও কম নির্ভরযোগ্য অংশীদারে পরিণত করছে।
লেখক পরিচিতি: আজহার আজম একজন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন। তাঁর বিশ্লেষণাত্মক লেখাগুলো আল জাজিরা, কেমব্রিজ মেলাফ/মানারা ম্যাগাজিন, ইউরেশিয়া রিভিউ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এশিয়া টাইমস এবং এক্সপ্রেস ট্রিবিউনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
