হরমুজ প্রণালি যদি খোলাই থাকে, তাহলে গ্যাস ও ডিজেলের দাম এত চড়া কেন?
হরমুজ প্রণালি আর অচল নেই। তবু জ্বালানির দাম কমছে না; বরং সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলছে তীব্রভাবে। এ এক জটিল সংকট—যার আর্থিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪.৩৬ ডলার। বছরের এই সময়ে জ্বালানির দর এত বেশি হওয়ার নজির অতীতে কখনও দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপের একাধিক জরুরি পদক্ষেপের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গত মাসে তৈরি হওয়া সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ডের চেয়ে ডিজেলের দাম এখন মাত্র ২০ সেন্ট দূরে।
সংক্ষেপে, ইরান যুদ্ধের জেরে তেল সরবরাহে যে টান পড়েছিল, তা আজ সর্বগ্রাসী জ্বালানি সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ আঘাত এসে লাগছে বিশ্বজুড়ে সাধারণ গাড়িচালক, ট্রাকচালক ও কৃষকদের ওপর।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় স্বস্তি সুফল এলেও, কিন্তু নৌপথটি এখনও ভীষণ বিপজ্জনক—আর সেই কারণেই ব্যয়বহুল। শুধু তা-ই নয়, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি রুশ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথিদের হামলায় বিঘ্নিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ।
গবেষণা সংস্থা পাইপার স্যান্ডলারের বৈশ্বিক জ্বালানি কৌশলবিদ ইয়ান স্টুয়ার্ট বলেন, 'যুদ্ধের কোনো মীমাংসা হয়নি। শান্তিও আসেনি। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার টুঁটি এখনও চেপে ধরা।'
তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কারের ভাড়ায় 'পাগলামি'
মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল বাইরে বের করে নিয়ে আসার আকাশচুম্বী খরচই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি কতটা মারাত্মক।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্লার্কসন্স-এর তথ্যমতে, গত বছরও পারস্য উপসাগর থেকে চীনে তেল পাঠানোর জন্য একটি সুপারট্যাঙ্কার (ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি নামে পরিচিত) ভাড়া করতে দিনে লাগত মাত্র ৬৫ হাজার ডলার।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্বালে এই দৈনিক ভাড়া লাফিয়ে পৌঁছায় ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
আর এখন? ক্লার্কসন্সের তথ্যমতে, ওই রুটে একটি ভিএলসিসি ট্যাঙ্কার পেতে দৈনিক গুনতে হচ্ছে ১৬ লাখ ডলার।
গাল্ফ অয়েল-এর প্রধান জ্বালানি উপদেষ্টা টম ক্লোজা বলেন, 'পুরো পাগলামি! আপনার নিজের যদি ট্যাঙ্কার থাকে, তাহলে আপনি সোনার খনির ওপর বসে আছেন—যতক্ষণ না তা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
কিন্তু সব ট্যাঙ্কার অক্ষত ফিরতে পারছে না।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্সের (ইউকেএমটিও) তথ্যমতে, শুধু গত কয়েক দিনেই হরমুজ প্রণালিতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি ছিল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার।
বিমার খরচ ও নাবিকদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি
তবে কেবল ট্যাঙ্কার ভাড়ার খরচই সব নয়।
আসল সংকট যুদ্ধাক্রান্ত জলসীমায় জাহাজ নিয়ে যাওয়ার জন্য নাবিকদের রাজি করানো। তার মূল্যও চোকাতে হচ্ছে চড়া।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ট্রিপের জন্য কোনো কোনো শিপিং কোম্পানি নাবিকদের ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক প্রস্তাব করছে। অঙ্কটা অনেক নাবিকের সারা বছরের আয়ের চেয়েও বেশি।
পণ্য দিয়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকির জন্য আকাশ ছুঁয়েছে জাহাজের বিমা খরচও।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক চক্কর তেল আনা-নেওয়ার (রাউন্ডট্রিপ) পেছনেই তেল উৎপাদনকারীদের এখন গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৪ কোটি ডলার।
বাস্তব দর বনাম কাগুজে দর
ট্যাঙ্কারের চড়া ভাড়া, নাবিকদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ আর রকেটগতিতে বাড়া বিমা প্রিমিয়াম—এই তিনের চাপই বিশ্বজুড়ে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে।
আগে পারস্য উপসাগর থেকে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেল বের করতে খরচ পড়ত মাত্র ২ ডলার। ক্লোজা-র তথ্যানুসারে, সেই খরচ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ ডলার।
তিনি বলেন, 'তেল আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণেই পাচ্ছি, কিন্তু এই পরিসংখ্যানটা বিভ্রান্তিকর। কারণ এই তেল বের করে আনার পেছনে যে খরচ হচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য।'
আর্থিক শেয়ারবাজারে তেলের দামের সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ায় তেলের মূল্যের যে বিশাল ফারাকের কারণ বোঝা যায় এই ঘটনায়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতিবার ডেটেড ব্রেন্টের দাম—অর্থাৎ বাস্তব দুনিয়ায় সরাসরি তেল হাতে পাওয়ার খরচ—ব্যারেলপ্রতি দাঁড়িয়েছে ১৩৫.৭৪ ডলার। এ ব্যয় ব্রেন্ট ফিউচার্সের প্রায় ১০০ ডলারের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি—এপ্রিলে তৈরি হওয়া সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ডের কাছাকাছি।
আর এই বাস্তব দরই ধাপে ধাপে আছড়ে পড়ছে গ্যাস স্টেশনে, যার পুরো ধাক্কা গিয়ে চাপছে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একের পর এক শোধনাগার
বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা এখন কেবল একটি যুদ্ধের ধাক্কা সামলাচ্ছে না। বরং একসঙ্গে দুটো, বলা যায় তিনটি যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে বিশ্ব।
একদিকে চলছে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ। শুরুতে যতটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে প্রলম্বিত হচ্ছে এই সংঘাত। তার সাথে যোগ হয়েছে ইয়েমেন ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী লড়াই।
হুথিদের ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ব্যাহত হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রুট বাব আল-মান্দেব প্রণালি।
আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ায় ইউক্রেনেয় ড্রোন হামলা। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডিজেল রপ্তানিকারক রাশিয়ার একের পর এক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হচ্ছে এসব হামলায়।
ঘরে জ্বালানি সংকটে পড়ে রপ্তানির লাগাম টানতে বাধ্য হয়েছে রাশিয়া। নিজেদের ঘাটতি এড়াতে জ্বালানি রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীনও। যদিও সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, রাশিয়া বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ করবে।
এখন পুরোদমে তেল উৎপাদন করছে শুধু মার্কিন তেল শোধনাগারগুলো। কিন্তু তারাও সক্ষমতার শেষবিন্দু পর্যন্ত গ্যাসোলিন, ডিজেল ও জেট ফুয়েল উৎপাদন করে চলেছে। তার ওপর বছরের এই সময়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেশ কিছু মার্কিন শোধনাগার উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে হারিকেন ইসায়াস-এর কারণে। এই ঝড় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোতে আঘাত হানলে বা উৎপাদন ব্যাহত করলে বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে।
উধাও হয়ে গেছে আপৎকালীন মজুত
জ্বালানির দাম এখনকার চেয়েও বহুগুণ বেশি হতে পারত, যাদি না বছরের শুরুর দিকে সারা বিশ্ব খারাপ সময়ের জন্য বেশ ভালো পরিমাণ জ্বালানি মজুত করে রাখত।
এই বাণিজ্যিক ও আপৎকালীন মজুত সংকটে 'শক অ্যাবজরবার' বা ধাক্কা সামলানোর ঢাল হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু সেই মজুতে এখন টান পড়েছে। মজুত তলানিতে ঠেকায় পরিস্থিতি একটু এদিক-ওদিক হলেই বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকা এ মজুতের কারণেই বর্তমান বাজারদর আরও লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে।
স্টুয়ার্ট বলেন, 'মজুত তলানিতে, ধাক্কা সামলানোর মতো আপৎকালীন সঞ্চয় আর আমাদের হাতে অবশিষ্ট নেই।'
হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহ যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে আসার পরও কেন ঝুঁকি ও দাম এত চড়া—এই পুরো চিত্রটাই তার জবাব।
ক্লোজা বলেন, 'তিনটি যুদ্ধই থামাতে হবে। অথবা তা যদি না-ও পারেন, অন্তত দুটোর লাগাম টানলেও খারাপ হবে না।'
