তীব্র গরমে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের ঝুঁকি বাড়ছে
তীব্র গরম গর্ভবতী মা ও তাদের নবজাতকদের দিন দিন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের জলবায়ু-প্রধান সাইমন স্টিল।
ফিজির নাদি-তে আয়োজিত 'প্রাক-কপ' সম্মেলনে দেওয়ার বক্তব্য এক নতুন জরিপের তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
ওই জরিপে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে তীব্র গরমের কারণে স্বাস্থ্যগত নানা জটিলতা তৈরি হতে দেখেছেন বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী।
স্টিলের বক্তব্য অনুসারে, 'তাপমাত্রা বৃদ্ধির অর্থ হলো গর্ভাবস্থায় বিপদের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তীব্র গরমের সঙ্গে অপরিণত প্রসব, মৃত সন্তান প্রসব, জন্মের সময় শিশুর কম ওজন এবং প্রসূতি মায়ের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির যোগসূত্র দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।'
স্টিলের ভাষ্যমতে, 'পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক। তীব্র গরম যত বাড়ছে, গর্ভাবস্থা ও প্রসবের বিষয়টি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের এক নতুন ও প্রাণঘাতী সংকটাপন্ন ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।'
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার প্রকোপ আরও বাড়ছে। এছাড়া একের পর এক তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড ভাঙছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোপার্নিকাস ক্লাইমেট অবজারভেটরির তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি জানিয়েছে, এ বছর পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে সাহেল অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকা পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি দেশ রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাস শুরুর পর থেকে উষ্ণতম জুলাই প্রত্যক্ষ করেছে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও জিম্বাবুয়ের ১ হাজার ধাত্রী ও চিকিৎসকের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করেছে দাতব্য সংস্থা ওয়েলকাম।
সংস্থাটির চেয়ারপারসন এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড এক বিবৃতিতে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে মা ও শিশুরা ক্রমাগত বাড়তি ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।
গিলার্ড বলেন, 'তীব্র গরম এক অদৃশ্য ঘাতক। কিন্তু তাই বলে গর্ভবতী নারীরা কারও চোখের আড়ালে থাকতে পারেন না। বিশ্বনেতাদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও সমাধানের পথ আছে—এখনই তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।'
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সব ধাত্রী ও চিকিৎসকই এমন কোনো না কোনো মা বা শিশুকে সেবা দিয়েছেন, যারা তীব্র গরমের বিরূপ প্রভাবে ভুগছিল।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানান, শিশুদের জন্মের সময় কম ওজন বা স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে জটিলতা এবং পানিশূন্যতা বা গরমজনিত অসুস্থতার মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা। তাদের বিশ্বাস, এসব সমস্যার পেছনে মূল কারণ ছিল তীব্র গরম।
উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ত্বকের উপরিভাগের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়ে যেতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ভ্রূণে পৌঁছানো অক্সিজেন ও পুষ্টির পরিমাণও কমে যায়।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতির কারণে মৃত সন্তান প্রসব, অকাল প্রসব ও জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
নবজাতকদের শরীর এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক থাকে। অতিরিক্ত গরমের কারণে তাদের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি নবজাতকের ঠিকমতো শ্বাস নেওয়া এবং মায়ের বুকের দুধ পানের ক্ষমতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
তীব্র গরম গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। গরম হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ফলে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস, বিপজ্জনক উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-একলাম্পসিয়ার ঝুঁকিও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে যায়।
যেসব নারী আগে থেকেই গরম আবহাওয়ায় অভ্যস্ত এবং যাদের শরীর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, তাদের চেয়ে যেসব এলাকায় তাপমাত্রা নতুন করে বা দ্রুত বাড়ছে, সেখানকার নারীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি মারাত্মক।
অসহনীয় গরম গর্ভাবস্থায় নারীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ওয়েলকামের জরিপে অংশ নেওয়া এক-চতুর্থাংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, তারা দেখেছেন, তাপপ্রবাহের সময় হাসপাতালে বা ক্লিনিকে নারী আসার সংখ্যা কমে যায়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশি, কারণ ওইসব দেশে লাখ লাখ মানুষকে পায়ে হেঁটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়।
প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ থাকার সঙ্গে অকাল প্রসব ও মৃত সন্তান জন্মদানের উচ্চ হারের সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, তাপমাত্রার সংস্পর্শ মাত্র ১ ডিগ্রি বাড়লে অকাল প্রসবের সম্ভাবনা প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর অতিরিক্ত আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হবে গরমজনিত ক্লান্তি, অপুষ্টি ও ম্যালেরিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি। ম্যালেরিয়া এখন এমন নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে মশা খুব সহজেই বাঁচতে ও রোগ ছড়াতে পারছে।
