ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, আটক ৪৪০; বেতন বাড়ানোর দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শিক্ষক, দমকলকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী। একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পৃথক বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ট্রেড ইউনিয়নগুলো জানিয়েছে, দেশব্যাপী একদিনের এই ধর্মঘটে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে পুলিশ মঙ্গলবার জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসে উপস্থিতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। কর্মপরিবেশের উন্নয়ন দাবির পাশাপাশি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট ছাঁটাই পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কর্মচারীরা।
এদিকে চার শতাধিক স্কুলে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুলে পুরোপুরি অবরোধ এবং ৪৪টিতে অবরোধের চেষ্টা চালানো হয়।
কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, শিক্ষার্থী ও কর্মী মিলিয়ে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন এবং অন্তত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সরকারের খসড়া বাজেট পেশ করার দুই দিন আগে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাত মাস আগে এই ধর্মঘট ও শিক্ষার্থীদের অস্থিরতা দেখা দিল। ইউনিয়নগুলোর তথ্যমতে, ২ বিলিয়ন ইউরো বাঁচাতে ২০২৭ সালে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার প্রস্তাব করেছে সরকার।
এটি কার্যকর হলে তা হবে টানা চতুর্থ বছর এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদে অষ্টম দফায় বেতন স্থগিত রাখার ঘটনা। ইউনিয়নগুলোর দাবি, এই স্থবিরতার কারণে কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা দুই অঙ্কের হারে হ্রাস পেয়েছে। তাই তারা বেতন ৬ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবারের সাধারণ সম্পাদক সোফি বিনেট এই বিক্ষোভকে 'রেড অ্যালার্ট' বা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করেছেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, 'এই ক্ষোভ সহজে থামবে না। সরকারকে বাজেটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতেই হবে।' পরবর্তী ধর্মঘটের সিদ্ধান্তের আগে প্রস্তাবিত ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনা প্রত্যাহারের জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি।
দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১১ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষক ও স্কুল কর্মচারী ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফরাসি শিক্ষকরা গড়ে কম বেতন পেয়ে থাকেন।
অন্যান্য বেসামরিক কর্মচারীদের প্রতি ১০ জনে একজনেরও কম এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে উপস্থিতির হার ছিল আরও কম। একদিনের বেতন কাটা পড়ার আশঙ্কা উপস্থিতি কম হওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে ফ্রান্সের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কয়েকটি বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে আগেই সতর্কতা জারি করেছিল।
মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন পেশাদার অগ্নিনির্বাপক কর্মীরাও। তাদের বক্তব্য, চলতি গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবানলে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। তবে তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ও তাঁর প্রশাসনের ওপর মানুষের অসন্তোষ কমানো যায়নি।
এদিকে রুটিন জটিলতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং চলতি বছরের তাপদাহে অতিরিক্ত গরম শ্রেণিকক্ষের মতো সমস্যার প্রতিবাদে শত শত স্কুলের সামনে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানী প্যারিসের পার্শ্ববর্তী ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ জন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী আহত হওয়ার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৪৮ জন সদস্যও আহত হয়েছেন। কোনো কোনো জায়গায় শিক্ষার্থীরা ময়লার পাত্রে আগুন দেয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, জবাবে পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বিএফএমটিভিকে জানান, ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে এখনও চূড়ান্ত হিসাব নেই, তবে আমাকে জানানো হয়েছে যে আটককৃতদের দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো কিছুই সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয় না।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব সংঘর্ষের নিন্দা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এদোয়ার্দ জেফ্রে।
তিনি লিখেছেন, 'এই সহিংসতা অবর্ণনীয়।' আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'এসবকে বৈধতা দেওয়া কিংবা... অবরোধ বাড়ানোর আহ্বান জানানো আমাদের শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা উভয়কেই বিপদে ফেলার শামিল। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন।'
প্যারিসের নিম্নআয়ের শহরতলি সেন-সাঁ-দেনিতে কট্টর বামপন্থি দল 'ফ্রান্স আনবোড'-এর সদস্য ও জেলা মেয়র বালি বাগায়োকো লিসি পল-এলুয়ার্দে বিক্ষোভকারী শত শত শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতীয় সংগীত গান এবং এই বিক্ষোভকে 'সম্পূর্ণ বৈধ' বলে আখ্যায়িত করেন। ধনী এলাকার তুলনায় দরিদ্র এলাকাগুলো কম বরাদ্দ পায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্যারিসের আরাগো স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীরা 'মাখোঁ বিস্ফোরণ' লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ময়লার পাত্রের ওপর বসে স্কুলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। এদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল। অন্যদিকে এলেন-বুশে স্কুলে একটি ব্যানারে লেখা ছিল 'কম পুলিশ, বেশি অর্থ'।
সেখানকার চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী মায়েল ব্রেটন বলেন, 'আমরা পুলিশের উপস্থিতি কম চাই। কারণ আমরা মনে করি, হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং সাধারণভাবে সামাজিক আন্দোলনগুলোর ওপর পুলিশ ব্যাপক দমনপীড়ন চালায়। এটি একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে যখন আমাদের স্কুলে এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় তহবিলের এমন প্রকট সংকট রয়েছে।'
সোমবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোরনু হাইস্কুলের বিক্ষোভকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করলেও স্বীকার করেন যে, 'হাইস্কুলগুলোর সমস্যাগুলো অবশ্যই শুনতে হবে এবং সমাধান করতে হবে।'
প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় কট্টর বামপন্থি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশন সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি সেবা খাতকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের বিরুদ্ধে সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার তোলুনা হ্যারিসের এক জনমত জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে যে, মেলেনশন এবং উগ্র ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মারিন ল্য পেন আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের লড়াইয়ে পৌঁছাবেন, যেখানে ল্য পেনের জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
