সরকারি সাইটসহ ‘ডজনখানেক’ প্রতিষ্ঠান হ্যাকের কথা স্বীকার ওপেনএআই-র, ফাঁস হয়েছে চ্যাটজিপিটির ছবিও
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই স্বীকার করেছে যে তাদের তৈরি নিয়ন্ত্রণহীন বা বিপথগামী এআই 'এজেন্ট'গুলো ডজনখানেক প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল সিস্টেমে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে একাধিক দেশের সরকারও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং ইউএস সেন্সাস ব্যুরোও রয়েছে—সেখান থেকে অননুমোদিতভাবে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছিল।
ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের এআই এজেন্টরা অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার চেষ্টা করায় তারা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে সতর্ক করতে বাধ্য হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের সার্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা মেডিকেয়ারের গোপন পরিসংখ্যানে ওপেনএআই এজেন্টের অননুমোদিত অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনার মাত্র কয়েক দিন পরই ওপেনএআই-এর পক্ষ থেকে এই স্বীকারোক্তি এল।
এর আগে গত শুক্রবারই ওপেনএআই স্বীকার করে যে তাদের এআই এজেন্টরা চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ৫৩টি ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করে দিয়েছে। এছাড়া গত জুলাইয়ে তাদের এআই এজেন্টদের একটি দল 'হাগিং ফেস' নামের একটি ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সাইবার হামলা চালিয়েছিল।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বনেতারা দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তির বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স শুক্রবার জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ওপেনএআই তাদের এআই এজেন্টদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অন্তত দুই ডজন ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে। তবে তাদের এই নিয়ন্ত্রণহীন এজেন্টগুলোর তৎপরতার সামগ্রিক পরিধি ঠিক কতটা বিস্তৃত ছিল, তা পুরোপুরি বুঝতে এখনো কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই পর্যালোচনা শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে ওপেনএআই।
এদিকে ফাঁস হওয়া ৫৩টি ছবির বেশিরভাগই ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাকিগুলো মুছে ফেলার জন্য হোস্টিং প্রদানকারীদের সাথে যোগাযোগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুক্রবার গভীর রাতে ওপেনএআই দাবি করে, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাদের মডেলগুলো মার্কিন সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিল, তবে সেখানে কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া বা বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলেনি। তাদের দাবি, এজেন্টরা নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য খুঁজতে গিয়ে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা বাধাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার বা বাইপাস করার চেষ্টা করেছিল। তবে সেগুলো কোনো গোপন তথ্য ছিল না, উন্মুক্ত তথ্য ছিল।
অন্যদিকে 'ট্রান্সলুস' নামের একটি অলাভজনক এআই গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, ওপেনএআই থেকে উদ্ভূত এজেন্টরা মার্কিন শিক্ষা বিভাগের নাগরিক অধিকার বিষয়ক একটি ওয়েবসাইট হ্যাক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল। ট্রান্সলুস জানায়, এটি সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে এআই এজেন্টদের নজরদারির একটি বৃহত্তর অংশ ছিল, যেখানে ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অ্যান্টি-বট সুরক্ষা এড়িয়ে যাওয়া এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরির মতো হ্যাকিং কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওপেনএআই এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে ট্রান্সলুসের প্রতিবেদনে উল্লেখিত কার্যকলাপগুলোর অনেকটাই তাদের চলমান তদন্তের সঙ্গে মিলে যায় এবং তারা সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে খতিয়ে দেখছে।
হাগিং ফেস হ্যাকের ঘটনার পর থেকেই গোটা এআই শিল্পের গবেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে কোম্পানিগুলো হয়তো তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে না। এই উদ্বেগের জেরে অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন সম্প্রতি প্রকাশ্যে পদত্যাগ করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে এআই ল্যাবগুলো 'আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে'। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিক প্রধান দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা শ্লথ করার এবং স্বয়ংক্রিয় আত্মউন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণেও অল্টম্যান বিশ্বনেতাদের এআই নিরাপত্তার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছানোর তাগিদ দেন।
এদিকে হোয়াইট হাউস শুক্রবার জানিয়েছে যে এআই দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ চ্যানেল স্থাপন করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ে ভীতিকে 'ধোঁকাবাজি' বলে উড়িয়ে দিলেও, চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরকালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন যে মানবজাতির কল্যাণে এআই পরিচালনা করার 'সক্ষমতা ও দায়িত্ব' উভয়ই বেইজিং ও ওয়াশিংটনের রয়েছে।
