আকস্মিকভাবে নৈশভোজ এড়িয়ে ভারত সফর থেকে দ্রুত ফেরার পর শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের নৈশভোজ এড়িয়ে যাওয়া এবং তড়িঘড়ি চীন ফিরে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অসুস্থতাকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে।
১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে গত সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারতে গিয়েছিলেন শি জিনপিং, কিন্তু অন্যান্য বিশ্বনেতাদের আগেই গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফিরে যান। চীন ফেরার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে আর দেখা যায়নি, যা এসব গুজবকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে।
ভারতের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য থেমে তার বাম পাশে বসে থাকা শি জিনপিংয়ের খোঁজ নিচ্ছেন।
শি জিনপিংয়ের দিকে সহযোগীরা দ্রুত এগিয়ে এলে ভারতীয় নেতা জিজ্ঞেস করেন, 'সব ঠিক আছে তো?' তিনি আবারও একই প্রশ্ন করলে জবাবে শি জিনপিং মাথা নাড়েন। এরপর মোদি আবার বক্তব্য শুরু করেন।
তবে বুধবার চীনের কয়েকজন সাংবাদিক এক্স-এ (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি চীনে নিষিদ্ধ) একটি দীর্ঘতর ভিডিও পোস্ট করে দাবি করেন যে, রিয়েল-টাইম অনুবাদের জন্য ব্যবহৃত ইয়ারপিসে কারিগরি সমস্যা হওয়ায় নরেন্দ্র মোদী সেটির বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ব্রিকস সম্মেলনে "সফল অংশগ্রহণ শেষে" রবিবার বিকেলে দিল্লি ত্যাগ করেছেন শি জিনপিং। ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর সম্মেলনে যোগ দেওয়ার যে নির্ধারিত সূচি ছিল, তার সফরসূচি সেটি মেনে চলেছে বলে মনে হলেও আদতে তিনি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মতো অবস্থান করেছিলেন।
৭৩ বছর বয়সী এই নেতার স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয় সোমবার থেকে, যখন একটি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক সংগঠন 'চীন ডেমোক্রেসি পার্টি'র চেয়ারম্যান এক্স-এ এক পোস্টে অভিযোগ করেন যে শি জিনপিং ব্রিকস সম্মেলনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন এবং তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বিমানে করে চীনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী শি ওয়ানজুন অভিযোগ করেন যে, শি জিনপিং মারাত্মক 'ইস্কেমিক স্ট্রোক'-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি দিল্লিতে চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ওয়ানজুন আরও দাবি করেন, নিজ দেশে অবতরণের পর চীনের প্রেসিডেন্টকে 'বেইজিং ৩০১ হাসপাতালে' নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, 'বিমানে ওঠার সময় শি জিনপিংয়ের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, তার পদক্ষেপ স্বাভাবিক ছিল না এবং তার শরীর বারবার বাম দিকে হেলে পড়ছিল।'
আমেরিকান সাংবাদিক বিল গার্টজ বুধবার বলেন, শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এবং দাবি করেন, প্রতিপক্ষ সামরিক বাহিনীগুলো গৃহযুদ্ধের জন্য সক্রিয় হচ্ছে বলেও জল্পনা-কল্পনা চলছে।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক হেনরি গাও জানান, 'যারা সাম্প্রতিক চীন-সংক্রান্ত গুজবগুলোকে কেবলই গুজব বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদের চীনা ইতিহাস নিয়ে পড়ালেখা করা দরকার।'
তিনি আরও বলেন, 'সঠিক হাতে পড়লে গুজবও রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গর্ডন চ্যাং পোস্ট করেছেন, 'শি জিনপিং সুস্থ নন। এবার চীন তার এই শারীরিক অবস্থা লুকিয়ে রাখতে পারেনি।' তিনি আরও বলেন, 'এমন সব চাঞ্চল্যকর গুজব ভাসছে যে চীনা সামরিক বাহিনী শি জিনপিংয়ের দুই সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু বো সিলাই এবং চৌ ইয়ংকাংকে মুক্ত করে দিয়েছে। এই গুজবগুলো যদি সত্যি হয়—যদিও তা বিশ্বাস করা কঠিন—তবে শি জিনপিং চীন ছেড়ে কোথাও যেতে নিরাপদ বোধ করবেন না।'
শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এই গুজব তার নির্ধারিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যেখানে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর তার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। গত এক বছরের মধ্যে এটি হতে যাচ্ছে তাদের তৃতীয় মুখোমুখি সাক্ষাৎ।
এদিকে, ব্রিকস-এর নৈশভোজে উপস্থিত থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা সম্মেলন থেকে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
৭৩ বছর বয়সী রামাফোসার দফতর জানায়, চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে সব ধরনের জনসমক্ষে উপস্থিতির কর্মসূচি থেকে বিরত রাখা হয়েছে। সোমবার দিল্লি থেকে ফেরার পর চিকিৎসকরা তাকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্রিকস সম্মেলনে পরিবেশন করা খাবারের সঙ্গেই রামাফোসার অসুস্থতার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। তবে সম্মেলনের মেনু নিয়ে আলোচনা কেবল সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতে বিরোধী দলগুলো বিদেশি নেতাদের নিরামিষ নৈশভোজ পরিবেশনের জন্য নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করেছে এবং তার বিরুদ্ধে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছে। উচ্চবর্ণের অধিকাংশ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মতো মোদি নিজেও একজন নিরামিষাশী।
