ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে: ট্রাম্প
দক্ষিণ আমেরিকায় ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য আরও জোরালো করল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার গভীর রাতে ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছে ওয়াশিংটন। সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধের জ্বালানিখাতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়, এটি বেসরকারি একটি কোম্পানির সাথে অংশীদারত্বের মাধ্যমে অন্য কোনো দেশের তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক অনুপ্রবেশ। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ৬৫ বিলিয়ন (৬ হাজার ৫০০ কোটি) ব্যারেেলেরও বেশি প্রমাণিত তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পাবে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রমাণিত মোট তেল সম্পদের প্রায় সমান।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই চুক্তিকে 'ঐতিহাসিক' হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এই চুক্তির আওতায় ১৭টি তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন, ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং ভেনেজুয়েলার সংকটগ্রস্ত সরকারের জন্য প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য কর আয়ের সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, গত জুনে ভয়াবহ ভূমিকম্পে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর থেকেই দেশটির সরকার জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে হিমশিম খাচ্ছে।
রদ্রিগেজ বলেন, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো "দেশের জাতীয় উন্নয়নে নিমিত্তে আমাদের এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানো।"
তবে এই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ ছিল এখনও পাওয়া যায়নি, মূল চুক্তির লিখিত কপিও তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন গত জানুয়ারিতে এক সামরিক অভিযান চালিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজের পূর্বসূরি নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এক প্রতিপক্ষ দেশকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল একটি অনুগত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, ট্রাম্প প্রশাসন সমগ্র আমেরিকা অঞ্চলে জ্বালানিখাতে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় ভেনেজুয়েলার তেলকে মূল হাতিয়ার বানায়। গত ছয় মাস ধরে ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলেও—এই অঞ্চলের বাড়তি উৎপাদন সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
এর আগের মার্কিন নেতারা অন্য কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকে মার্কিন সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে প্রকাশ করা এড়িয়ে চলতেন। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, বৈশ্বিক আইনি প্রশ্ন এবং এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা সতর্ক অবস্থান নিতেন।
কিন্তু ট্রাম্প এবং তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, ভেনেজুয়েলায় তাঁদের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই ছিল দেশটির বিপুল তেল সম্পদ।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগেই মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয়করণের নামে ভেনেজুয়েলা সরকার মার্কিন তেল ক্ষেত্রগুলোকে 'চুরি' করে।
তবে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো জাতীয় তেল কোম্পানি নেই, যার মাধ্যমে তারা সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারে। এবিষয়ে মন্তব্যের জন্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় কর্মরত একটি "অভিজ্ঞ বেসরকারি অপারেটরের" সঙ্গে গঠিত যৌথ উদ্যোগের আওতায় মোট উত্তোলন করা তেলের ৫৫ শতাংশ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
সাধারণত ভেনেজুয়েলায় তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলন পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি 'পেত্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা' (পিডিভিএসএ) অথবা তাদের সাথে বেসরকারি কোম্পানির যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে।
ভেনেজুয়েলায় তাদের কার্যক্রম বড় পরিসরে সম্প্রসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল কোম্পানি- শেভরন দেশটির কর্মকর্তাদের সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছে। আলোচকদের সূত্র ধরে এই তথ্য জানা গেছে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এ সংক্রান্ত চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেভরনের সেই চূড়ান্ত আলোচনার পরই শুক্রবার ট্রাম্প এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি দিলেন।
দেশটিতে সক্রিয় একমাত্র বৃহৎ মার্কিন কোম্পানি শেভরনের যেকোনো নতুন বিনিয়োগ দেশটির সংকটাপন্ন তেল শিল্প এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।
ভেনেজুয়েলায় শেভরনের নতুন বিনিয়োগের আলোচনার বিষয়টি এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনেও প্রকাশিত হয়েছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে অন্যান্য আরও একাধিক মার্কিন তেল কোম্পানি। তবে এপর্যন্ত যে সাফল্য পাওয়া গেছে, তার বেশিরভাগই প্রাথমিক স্তরের বা তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবাশ্ম তেলের মজুত থাকা ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই গত কয়েক দশক ধরে দেশটির রাজনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিল।
