কেন দীর্ঘ প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম চিনি আমদানি করছে ভারত
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিনি ভোক্তা ভারত এবার উৎসবের মৌসুমে তিক্ত-মধুর পরিস্থিতি এড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত দুই মাসে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘ এক দশকের মধ্যে এই প্রথম ১০ লাখ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার।
আগস্ট থেকে ভারতে চিনির চাহিদা বাড়তে শুরু করে। গণেশ চতুর্থী, দশেরা ও দীপাবলির মতো উৎসবের পর শুরু হয় ব্যস্ত বিয়ের মৌসুম। এ সময় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলোও বছরের অন্যতম ব্যস্ত বিক্রির মৌসুমকে সামনে রেখে চিনি মজুত শুরু করে, যা পাইকারি বাজারে দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
বর্তমান উৎপাদন মৌসুমে—যা ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—ভারতে চিনি উৎপাদন ৩ কোটি ৬ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি সরকারের আগের ৩ কোটি ৪৩ লাখ টনের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ কম।
সরবরাহ সংকটে চিনির দাম হু হু করে বেড়েছে। মে-জুনে যে চিনি প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ রুপিতে বিক্রি হতো, আগস্টে দেশের বিভিন্ন বাজারে তা ৫৮ থেকে ৬০ রুপির বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। যদিও সম্প্রতি দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও ভারতকে কেন চিনি আমদানি করতে হচ্ছে?
সরকারের দাবি, এল নিনোর প্রভাবে কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় আখের উৎপাদন কমেছে। এর পাশাপাশি মজুতদারি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান চিনি উৎপাদক দেশে সরবরাহ কমে যাওয়াও সংকটের জন্য দায়ী।
তবে কৃষি ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সরকারের নীতিনির্ধারকদের 'হিসেবি ভুল'। ভারত তার চিনি উৎপাদনের প্রকৃত সক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছিল এবং দেশে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার আগেই বিপুল পরিমাণ চিনি বিদেশে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল।
চলতি মৌসুমের শুরুতে ভারত সরকার প্রথমে ১.৫ মিলিয়ন টন চিনি রপ্তানির অনুমোদন দেয় এবং পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারিতে আরও ৫ লাখ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। মে মাসে চিনি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করার আগেই দেশ থেকে প্রায় ৮ লাখ টন চিনি বিদেশে জাহাজীকরণ বা রপ্তানি হয়ে গিয়েছিল।
ফিলিপক্যাপিটাল ইন্ডিয়া-র জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বিক্রম সূর্যবংশী বলেন, 'মৌসুমের শুরুতে চিনি রপ্তানির অনুমতি দেওয়া এবং শেষ সময়ে এসে ১০ লাখ টন চিনি আমদানি করা—উৎপাদনের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে এটি এক বিশাল গরমিল এবং বড় ধরনের
বিস্ময়।'
ভারতের জন্য এটি বড় ধাক্কা কারণ দেশটিতে চিনির কোনো উদ্বৃত্ত নেই। গত মৌসুমে ভারতে ২৮ মিলিয়ন টনেরও বেশি চিনি ব্যবহার হয়েছে, যা এ বছরের মোট প্রত্যাশিত উৎপাদনের প্রায় সমান। এছাড়া পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি অনুযায়ী ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩ মিলিয়ন টন চিনি ব্যবহার হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে চিনি ঘাটতি মেটানোর আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না।
ভারতের সবচেয়ে বড় চিনি শোধনকারী প্রতিষ্ঠান 'শ্রী রেণুকা সুগারস'-এর অ-নির্বাহী পরিচালক অতুল চতুর্বেদী বলেন, এই আমদানি মূলত একটি বাফার বা জরুরি মজুত গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য বন্দর এলাকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকা চিনি শোধনাগারগুলোকে শুল্কমুক্ত চিনি দেশীয় বাজারে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই শোধনাগারগুলো সাধারণত অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে তা পরিশোধন করে পুনরায় বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। ভারত সর্বশেষ ২০১৬ সালে তীব্র খরার সময় অভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্য চিনি আমদানি করেছিল।
এছাড়া 'ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশন' চিনি কলগুলোকে অক্টোবরে নতুন ফসল আসার ১৫ দিন আগেই আখ মাড়াইয়ের কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে আগামী মৌসুমের আখের ফলনও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আখ একটি অত্যন্ত পানি-সংবেদনশীল ফসল। ভারতের প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ এবং কর্ণাটকে অনিয়মিত বর্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতির কারণে আখের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আখের আকার ছোট হওয়ায় এবং তাতে সুক্রোজ বা মিষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ায় চিনি উৎপাদনের হার অনেক হ্রাস পাবে।
চতুর্বেদী বলেন, 'জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আগামী মৌসুমেও বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।'
অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারত এর আগেও চাল ও গমের মতো বিভিন্ন কৃষি পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল। ২০২৩ সালে যেমন দেশি চালের দাম বাড়ার পর বাসমতি ছাড়া অন্য সব সাদা চাল রপ্তানির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল মোদি সরকার।
ভারতের কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সিরাজ হুসেন বলেন, 'প্রতিকূল আবহাওয়া এবং আখের কিছু জাতের রোগবালাইয়ের কারণে এবার সরকারের প্রাথমিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।' তবে ১৩ মে চিনি রপ্তানি বন্ধ করার আগে কেন এই ঘাটতির বিষয়টি সরকার চিহ্নিত করতে পারেনি, সে বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
অনেক বিশ্লেষক চিনির এই সংকটের জন্য সরকারের ইথানল মিশ্রণ নীতিকে (পেট্রোলের সঙ্গে ২০% ইথানল মিশ্রিত করার সরকারি বাধ্যতামূলক নিয়ম) দায়ী করছেন। সরকার আগে উদ্বৃত্ত সময়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ শতাংশ চিনি ইথানল তৈরিতে ব্যবহারের অনুমতি দিত। কিন্তু এবার চিনির উৎপাদন কম থাকা সত্ত্বেও এই নীতি বজায় রাখায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সরকার অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ইথানল উৎপাদনে চিনি ব্যবহারের হার ২০২২-২৩ সালের ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০২৫-২৬ সালে ৯ শতাংশে আনা হয়েছে।
ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের দীপক বাল্লানি দাবি করেছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির কারণেই দাম বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যে পাইকারি বিক্রেতাদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০০ টন চিনি মজুত রাখার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ভারতের চিনি আমদানির এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন বিশ্বজুড়েই চিনির বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে। এল নিনোর কারণে থাইল্যান্ডে আখের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিনি উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলে অতিবৃষ্টির কারণে আখ মাড়াই ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র তাপদাহে ইউরোপের সুগার বিট (চিনির জন্য ব্যবহৃত বিট) চাষ ব্যাহত হওয়ায় ফ্রান্সে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন চিনি উৎপাদনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর ফলে বৈশ্বিক চিনি উৎপাদন আগের বছরের ১৮৬.১ মিলিয়ন টন থেকে কমে ১৮৪.৯ মিলিয়ন টনে নামবে বলে মার্কিন কৃষি বিভাগ পূর্বাভাস দিয়েছে। গত আগস্টে লন্ডনের হোয়াইট সুগার ফিউচারে চিনির দাম টন প্রতি ৫৪১ ডলারে উন্নীত হয়েছিল, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। আর ভারত চিনি আমদানির ঘোষণা দেওয়ার দিনই নিউ ইয়র্কের র সুগার ফিউচারে দাম এক ধাক্কায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
চিনির এই তীব্র সংকট থেকে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আউটপুট বা ফসলের পূর্বাভাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের আরও অনেক বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
