ভারতের ভূখণ্ড নিজেদের দাবি নেপালের, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না চুক্তির কাগজ
সভ্যতার দিক থেকে প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও নেপালের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ২১০ বছরের পুরোনো একটি চুক্তি। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা আছে। সেটি হলো সেই মূল চুক্তির নথি কোথায় আছে তা নেপাল নিশ্চিত নয়।
নেপাল সরকার দেশটির সংসদকে জানিয়েছে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির মূল নথি তাদের কাছে রয়েছে কি না, তা তারা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই চুক্তির মাধ্যমে হিমালয় অঞ্চলের রাজ্য নেপালের সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সংসদীয় একটি অনুসন্ধান কমিটি বিভিন্ন সংরক্ষণাগার, মন্ত্রণালয় ও জাদুঘরে খোঁজ চালিয়েও চুক্তিটির মূল নথি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও নেপালের মধ্যে লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা সীমান্ত বিরোধ উত্তেজনা তৈরি করার সময়ই চুক্তিটির মূল নথি নিয়ে এই অনিশ্চয়তার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
নেপালের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে সুগৌলি চুক্তি। দেশটি এই চুক্তির ভিত্তিতেই দাবি করে আসছে যে লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি নেপালের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ভারত বলে আসছে, এসব এলাকা তার উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অংশ।
ভারত ও নেপালের সীমান্ত বিরোধের একটি বড় অংশ নির্ভর করছে কালী বা মহাকালী নদীর উৎস কোথায়—এ বিষয়ে দুই দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যার ওপর। কারণ চুক্তিতে এই নদীকে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সুগৌলি চুক্তি থেকে উদ্ভূত এই সীমান্ত বিরোধ বারবার ভারত-নেপাল সম্পর্ককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২০ সালে সাবেক নেপাল প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি যখন তার সরকার রাজনৈতিক সংকটে ছিল, তখন তিনি এই ভূখণ্ডগত বিরোধকে বড় ধরনের জাতীয়তাবাদী ইস্যুতে পরিণত করেন।
তার সরকার একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যাতে তিনটি বিতর্কিত এলাকাকেই—লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি—নেপালের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নেপালের সংসদ পরে একটি সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে এই মানচিত্র অনুমোদন করে।
ভারত এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে একে 'কৃত্রিমভাবে নেপালের ভূখণ্ডগত দাবি সম্প্রসারণ' হিসেবে আখ্যা দেয়। এর ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গুরুতরভাবে চাপে পড়ে।
নেপাল যে চুক্তির মূল নথি খুঁজে পাচ্ছে না, এই তথ্যটি এমন সময় সামনে এলো, যখন কয়েক মাস আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ সংসদে আরেকটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
তিনি সংসদে বলেছিলেন, 'প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমি জানতে পারি, শুধু ভারতই নেপালের ভূখণ্ড দখল করেনি, নেপালও বিভিন্ন জায়গায় ভারতের ভূখণ্ড দখল করেছে।'
এই বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও পরে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরিষ্কার করে জানায়, প্রধানমন্ত্রী কারিগরি কারণে সীমান্তের উভয় পাশে এক দেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের দখলে থাকা বা ব্যবহারের বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন।
মন্ত্রণালয় আরও স্পষ্ট করে জানায়, বিতর্কিত ভূখণ্ডগুলোর বিষয়ে নেপালের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এরপর ভারত ও চীন লিপুলেখ দিয়ে বাণিজ্য পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মত হলে ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হয়।
নেপাল এর প্রতিবাদ জানায় এবং বলে, লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি তার ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখন, যখন মূল নথিগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন প্রশ্ন উঠছে—লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরার ওপর নেপালের দাবির ক্ষেত্রে এর অর্থ কী?
নেপালের মূল সুগৌলি চুক্তি কোথায়?
নেপালের প্রতিনিধি পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্বীকার করেন, সরকারের কাছে মূল চুক্তিটি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
খানাল সংসদে বলেন, 'নেপাল সরকারের কাছে সরকারি চুক্তির নথিগুলো রয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। কিছু চুক্তিসংক্রান্ত নথি জাতীয় সংরক্ষণাগারে রাখা আছে—এমন রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু সেগুলোই প্রকৃত সরকারি চুক্তি কি না, সে বিষয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই।' নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
খানাল বলেন, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি এবং ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি—উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি নেপালের কাছে রয়েছে।
তবে মূল নথিটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা নতুন কোনো বিষয় নয়।
২০১৬ সালে নেপাল-ভারত সম্পর্কবিষয়ক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দল ১৯৫০ সালের চুক্তিটি পর্যালোচনা বা পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করলে নেপালের পক্ষ থেকে চুক্তিটির মূল কপি খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু তারা সেটি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।
পরে নেপাল সরকার ভেখ বাহাদুর থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে চুক্তিটির দ্বিতীয় একটি কপি সরবরাহ করে বলে বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।
এরপর অনুসন্ধানের পরিধি আরও বাড়ানো হয়।
একটি সংসদীয় অনুসন্ধান কমিটি গ্রন্থাগার, সংরক্ষণাগার ও বিভিন্ন নথি সংরক্ষণাগারে খোঁজ চালায়।
এ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, নারায়ণহিতি প্রাসাদ জাদুঘর, আইন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও অনুসন্ধান চালানো হয়।
অনুসন্ধানে সিদ্ধান্তে আসা হয় যে সুগৌলি চুক্তি এবং ১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত চুক্তি—দুটিরই মূল কপি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০১৯ সালে তৎকালীন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ গ্যাওয়ালিও একই ধরনের অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করেছিলেন।
তিনি ২০১৯ সালে বলেছিলেন, 'আমাদের কাছে দুটি চুক্তিই রয়েছে, তবে এসব কপি মূল নথি কি না, তা ফরেনসিকভাবে যাচাই করতে হবে।'
তিনি আরও বলেছিলেন, 'আমরা ভারত ও যুক্তরাজ্যেও ঐতিহাসিক নথি ও মানচিত্র খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি।'
কেন ২১০ বছরের পুরোনো এই চুক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ?
১৮১৪ থেকে ১৮১৬ সালের অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর সুগৌলি চুক্তি করা হয়।
এই যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ভারত ও হিন্দু রাজতন্ত্রের দেশ নেপালের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়।
১৮১৫ সালের ডিসেম্বরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৮১৬ সালের মার্চে তা অনুমোদন করা হয়।
চুক্তিটি নেপালের আধুনিক ভূখণ্ডগত সীমারেখার ভিত্তি তৈরি করে।
বর্তমান সীমান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে চুক্তিটির পঞ্চম অনুচ্ছেদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নেপাল কালী নদীর পশ্চিমে অবস্থিত ভূখণ্ডের ওপর তার দাবি ত্যাগ করে। এর ফলে নদীটি নেপালের পশ্চিম সীমান্তে পরিণত হয়।
কিন্তু এর মাধ্যমে এমন একটি প্রশ্ন তৈরি হয়, যার উত্তর দুই শতাব্দী পরও পুরোপুরি মেলেনি।
কালী নদীর প্রকৃত উৎস ঠিক কোথায়?
নেপালের দাবি, কালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরায়।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ কালী নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত। ফলে এগুলো নেপালের ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, লিপুলেখ অঞ্চলের নিচের ঝরনাগুলো থেকেই কালী নদীর উৎপত্তি।
ভারত তার দাবির সমর্থনে প্রশাসনিক ও রাজস্ব নথির কথা উল্লেখ করে।
ভারতের দাবি, ঐতিহাসিকভাবে কালাপানি অবিভক্ত উত্তর প্রদেশের পিথোরাগড় জেলার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে, যা বর্তমানে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
উভয় দেশই তাদের দাবির পক্ষে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র ও বিভিন্ন নথি ব্যবহার করেছে।
এখানে আরও একটি ঐতিহাসিক জটিলতা রয়েছে।
চুক্তিটিতে লিম্পিয়াধুরাকে কালী নদীর উৎস হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া চুক্তিটির সঙ্গে এমন কোনো পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত মানচিত্র ছিল—যেখানে নদীটির উৎস নির্দিষ্ট করে দেখানো হয়েছে—এমন প্রমাণও জানা নেই বলে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে।
এই জটিলতার কারণে ঐতিহাসিক নথি, মানচিত্র ও সংরক্ষণাগারে থাকা বিভিন্ন দলিল দুই দেশের দাবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওলি যখন নেপালের মানচিত্রে লিপুলেখ যুক্ত করেন
২০২০ সালে ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধ নাটকীয়ভাবে তীব্র হয়ে ওঠে।
ভারত উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে লিপুলেখকে যুক্ত করে কৈলাস মানসসরোবর যাওয়ার পথে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক উদ্বোধন করে।
নেপাল এর প্রতিবাদ জানিয়ে দাবি করে, সড়কটি তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে।
এর জবাবে ওলির সরকার একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে।
সেই মানচিত্রে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানিকে নেপালের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এমনকি পরে এই মানচিত্র নেপালের সংবিধানেও যুক্ত করা হয়।
নেপালের সংসদ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে, যার মাধ্যমে সংশোধিত মানচিত্রটি দেশের জাতীয় প্রতীকের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ভারত এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে।
ভারত বলেছিল, 'একতরফা এই পদক্ষেপ ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়' এবং নেপালের ভূখণ্ডগত দাবির এই সম্প্রসারণকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে।
এই বিরোধ দুই দেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করে।
দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে 'রুটি-বেটির সম্পর্ক', উন্মুক্ত সীমান্ত এবং গভীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়ে আসছে।
ইতিহাস ও উত্তেজনার এই মিশ্র পরিস্থিতিতে এখন কাঠমান্ডু স্বীকার করেছে যে, দুই শতাব্দী ধরে সীমান্ত ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত মূল চুক্তির নথিগুলো তাদের কাছে আদৌ রয়েছে কি না, সেটিও তারা এখনো নিশ্চিত করতে পারছে না।
