এয়ার ফোর্স ওয়ান নিয়ে প্রতিবেদন করা নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের সমন প্রত্যাহার করছে ট্রাম্প প্রশাসন
কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়ে প্রেসিডেন্টের ভ্রমণের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের ওপর জারিকৃত সমন প্রত্যাহার করবে ট্রাম্প প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার আদালতের এক শুনানিতে এক সরকারি প্রসিকিউটর এই তথ্য জানান।
ম্যানহাটনের ইউএস অ্যাটর্নি জে ক্লেটন কর্তৃক গত ১০ জুলাই জারিকৃত এই সমনগুলো ছিল মূলত তথ্য ফাঁসের তদন্তে সাংবাদিকদের তাদের গোপন সূত্রের তথ্য প্রকাশে বাধ্য করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরা বলছেন, সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করে।
তথ্য ফাঁসের তদন্তে সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড তলব বা সমন জারির বিষয়সহ আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে সরকারি আইনজীবীদের প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ অরুণ সুব্রমানিয়ান জিজ্ঞাসাবাদ করার পর, ক্লেটনের কার্যালয়ের এক প্রসিকিউটর এই সিদ্ধান্তের কথা আদালতকে জানান।
প্রসিকিউটর শন বাকলি বলেন, 'সরকার একতরফাভাবে এই সমনগুলো প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত।' তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই তদন্ত এখনো চলছে এবং সরকার চাইলে সাংবাদিকদের পুনরায় সমন পাঠাতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী ইউএস ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স হিসেবে মনোনীত জে ক্লেটন এই সমনগুলো জারি করেছিলেন। এর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন বিমানে অ্যান্টি-মিসাইল এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অভাব থাকায় ট্রাম্প তুরস্ক থেকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে যাত্রা করেছিলেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটি জাতীয় প্রতিরক্ষার অত্যন্ত গোপন তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে 'মারাত্মক ঝুঁকি' তৈরি করেছে; বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন প্রেসিডেন্ট শত্রুভাবাপন্ন দেশের হুমকির মুখে আকাশপথে ভ্রমণ করছিলেন (যা মূলত ইরানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছিল)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে তৈরি করা এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল, যখন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের একটি যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস বিচারক সুব্রমানিয়ানের কাছে এই সমনগুলো বাতিলের আবেদন জানিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এই সমনগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে জারি করা হয়নি এবং এটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।
এক আইনি নথিতে টাইমস উল্লেখ করেছে, এই সমনগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভয় দেখানো। প্রতিষ্ঠানটি আরও অভিযোগ করেছে যে, প্রসিকিউটররা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সমন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ নীতি লঙ্ঘন করেছেন; যা সাধারণত অত্যন্ত বিরল একটি পদক্ষেপ এবং এর জন্য বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তদন্ত এখনও চলছে এবং যারা গোপন তথ্য ফাঁস করে জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করবে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।
প্রসিকিউটর বাকলি অবশ্য বিচার বিভাগ কর্তৃক অবৈধভাবে সমন জারির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড গোপনে তলব করার বিষয়টি তাদের আগে জানানো হয়নি।
শুনানি শেষে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক বিবৃতিতে জানায়, সরকার 'স্বীকার করেছে যে সমনগুলো আইন লঙ্ঘন করেছে' এবং এগুলো কখনোই জারি করা উচিত ছিল না।
গত মঙ্গলবারের এক আইনি আবেদনে প্রসিকিউটররা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রথম সংশোধনী কোনো ফৌজদারি তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয় না।
রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনের আমলেই তথ্য ফাঁসের তদন্তে সাংবাদিকদের সূত্র প্রকাশে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে গণমাধ্যম অধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমন ও সার্চ ওয়ারেন্ট অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছে, যার মধ্যে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলোও রয়েছে। তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত মামলার মাধ্যমে গণমাধ্যমকে হয়রানি ও ভয় দেখানোর অভিযোগও তুলেছে।
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, তারা তথ্য ফাঁসের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে নয়। অন্যদিকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের মিথ্যা খবরের বিরুদ্ধে তারা তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চান।
