উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ইরাকে গোপন সেল গঠন করেছে আইআরজিসি
উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন বাহিনী রয়েছে, তাদের ওপর হামলা চালাতে ইরাকে নতুন গোপন সেল তৈরি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। মূলত গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে এবং ইরাকের পরিচিত মিলিশিয়া বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পাশ কাটাতেই এই নতুন সেলগুলো তৈরি করা হয়েছে। ইরাকের আটটি সূত্র রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তিনটি সূত্র জানায়, আইআরজিসি ইরাকে তিন থেকে চারটি সেল তৈরি করেছে, যার প্রতিটিতে প্রায় ১০ জন করে বাছাই করা ইরাকি শিয়া যোদ্ধা রয়েছেন। এই সেলগুলো ২০ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দক্ষিণ ইরাকের বসরা এবং সামাওয়া শহরের কাছের মরুভূমি থেকে কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত সাতটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এই সেলগুলোর অনেক সদস্যকেই 'ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক' থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত হাজার হাজার যোদ্ধা নিয়ে গঠিত ইরাকের কট্টরপন্থী শিয়া দলগুলোর একটি জোট।
কিন্তু রয়টার্সের সূত্রগুলো বলছে, নতুন এই দলগুলো ওই জোটের কমান্ড স্ট্রাকচার বা কাঠামোর বাইরে কাজ করে এবং তারা সরাসরি আইআরজিসির নির্দেশমতো চলে। রয়টার্সের এই আটটি সূত্রের মধ্যে দুজন ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা, একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং পাঁচজন স্থানীয় মিলিশিয়া কমান্ডার রয়েছেন।
কৌশল পাল্টাচ্ছে আইআরজিসি
ইরাকে নতুন এই গোপন সেল তৈরির বিষয়টি আগে কখনো প্রকাশ পায়নি। পাঁচজন মিলিশিয়া কমান্ডার জানিয়েছেন, আইআরজিসি মূলত তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো (প্রক্সি) বর্তমানে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং খোদ ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদও ফুরিয়ে আসছে। এ অবস্থায় পুরো অঞ্চলে নিজেদের শক্তি বজায় রাখতেই ইরান এই নতুন ছক কষেছে।
শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকে অনেক মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের বেশির ভাগেরই তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। গাজা ও লেবানন থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের আঞ্চলিক 'অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' বা প্রতিরোধ বলয়ের অন্যতম প্রধান খুঁটি হলো এই গোষ্ঠীগুলো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে, 'ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক'-এর ব্যানারে কাজ করা গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন সম্পদের ওপর কয়েক ডজন ড্রোন ও রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে ইরাকের ভেতরে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কোনো বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা বা সমাবেশ দেখা যায়নি।
গত বছর থেকেই সেখানকার বেশ কয়েকটি শক্তিশালী শিয়া গোষ্ঠী ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে তারা অস্ত্র সমর্পণ করতে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে প্রস্তুত। শিয়া শাসক জোটের দুই আইনপ্রণেতা এবং ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জসিম আল-বাহাদলি জানান—শিয়া গোষ্ঠীগুলোর এমন সিদ্ধান্তের কারণেই হয়তো আইআরজিসি সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
ইরাকের মাটিতে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দেওয়ার জন্য বাগদাদ সরকারকে বারবার সতর্ক করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের এমন হুঁশিয়ারির পর এই মাসেই 'আসাইব আহল আল-হাক' এবং 'ইমাম আলী ব্রিগেডস' নামে দুটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র সমর্পণ শুরু করার ঘোষণা দেয়।
শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশেষজ্ঞ বাহাদলি বলেন, 'আইআরজিসি'র তৈরি করা এই নতুন দলগুলো আকারে ছোট হলেও মতাদর্শের দিক থেকে অনেক বেশি উগ্র এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে নিজেদের শক্তি ও সম্পদ বাঁচাতে ইরানের কৌশলের প্রতিফলন এটি।'
