বাবা-মা কখনো প্রশংসা করেননি, তাই অনলাইনে ‘ভার্চ্যুয়াল বাবা-মা’ খুঁজে নিয়েছেন ভিনসেন্ট
সাংহাইয়ের এক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের কর্মী ভিনসেন্ট ঝাং। খাওয়ার সময় তিনি প্রায়ই পকেট থেকে ফোন বের করে তার 'ভার্চ্যুয়াল বাবা-মায়ের' খোঁজ নেন। অনলাইনে এই মাঝবয়সী দম্পতির কাজই হলো তাদের কাল্পনিক সন্তানের জন্য অবিরাম ভালোবাসার কথা বলা।
তাদের অন্যতম জনপ্রিয় একটি ভিডিওতে এই জুটিকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলতে দেখা যায়, 'ইদানীং কি কাজ আর পড়াশোনা নিয়ে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ? নিজেকে এত চাপ দিয়ো না। মা-বাবা জানে যে তুমি অনেক কষ্ট সহ্য করেছ।'
ভিডিওর নিচে মন্তব্যের ঘরে অনেকেই এই দম্পতিকে মা-বাবা বলে ডাকেন, নিজেদের জীবনের গল্প শোনান এবং জন্মদিনের আশীর্বাদ চান।
টিকটকের মতো অ্যাপ 'ডউয়িন'-এ প্যান হুচিয়ান এবং ঝাং জিউপিং দম্পতির প্রায় ২ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে। তারা মূলত 'ভার্চ্যুয়াল বাবা-মা' নামক একটি বিশেষ শ্রেণির কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
তাদের জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে চীনের তরুণ প্রজন্মের কাছে, যারা একদিকে জীবনে সফল হওয়ার চেষ্টা এবং অন্যদিকে পরিবারের প্রত্যাশার চাপে পিষ্ট হচ্ছেন।
৩৩ বছর বয়সী ভিনসেন্ট বলেন, 'আমার বাবা-মা কখনোই আমাকে বলেননি যে নিজেকে এত চাপ দিয়ো না বা তুমি এমনিতেই অনেক ভালো করছ। কিন্তু ভার্চ্যুয়াল বাবা-মা অন্তত জিজ্ঞেস করে যে আমি আজ খুশি কি না।'
ভ্লগার প্যান জানান, দর্শকদের ওপর তার ভিডিওর প্রভাব তিনি বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারেন। ২০২৪ সালে ডউয়িনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, দর্শকদের কষ্টের কিছুটা তিনি নিজেও বোঝেন। কারণ, তার নিজের শৈশবও খুব কঠিন ছিল।
প্যান জানান, তার যখন ১৪ বছর বয়স, তখন তার মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে পরিবারের হাল ধরতে তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। তিনি বলেন, 'আমি ৩৩ বছর বাড়িছাড়া ছিলাম, কিন্তু আমার বাবা-মা কখনো আমাকে উৎসাহ দিয়ে একটা কথাও বলেননি।'
প্যান জানান, নিজের মেয়ে জন্ম নেওয়ার পর তিনি একটি ভিন্ন পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সব সময় মেয়েকে বলেন যে তিনি তাকে ভালোবাসেন। তাদের ভিডিওতে প্রায়ই তাদের মেয়েকে দেখা যায়।
এই কথাগুলো ভিনসেন্টের জীবনের সঙ্গে খুব মিলে যায়। সাংহাইয়ে থাকা এই ওয়েব ডেভেলপার জানান, সপ্তাহে একবার বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোন কলে কথা বলাটাও তার কাছে খুব মানসিক চাপের মনে হয়।
তার বাবা-মা প্রায়ই তার ক্যারিয়ার নিয়ে সমালোচনা করেন, কারণ তারা মনে করেন ভিনসেন্টের বর্তমান চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরি অনেক বেশি স্থিতিশীল।
ভিনসেন্ট বলেন, 'ফোন কল শুরু হতেই আমার সব কাজ ও সিদ্ধান্তের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে তারা।'
ঝাও এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় বড় হয়েছেন। এই সময়ে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
তাদের দাদা-দাদিরা ১৯৫০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৬০-এর দশকের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। আর তাদের বাবা-মায়েরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন দেশ ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হচ্ছিল।
তবে ঝাওয়ের প্রজন্ম একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং অনেক উন্নত জীবনযাত্রার মধ্যে বড় হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে চীন এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মহামারির পর চীনের ধীরগতির অর্থনীতির কারণে তরুণরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বছরের পর বছর ধরে ১৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সরকার এই বিষয়টিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করলেও এটি তাদের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিন দিন আরও বেশি তরুণ ক্লান্ত অনুভব করার কথা বলছেন। এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কোনো মানে আছে কি না, তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই তাদের বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন ও প্রত্যাশার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কিছু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অনলাইনে এই আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে প্রথাগত 'পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি ও আনুগত্যের' দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তরুণদের বাবা-মায়ের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কিন্তু ভিনসেন্ট এতে রাজি নন। তিনি বলেন, 'আমি আমার বাবা-মায়ের কষ্ট বুঝতে পারি, কিন্তু আমার নিজের প্রজন্মের ট্রমাও তো আছে।'
চীনের তরুণদের মধ্যে ইদানীং বাবা-মায়ের শাসন নিয়ে বহুল চর্চা শুরু হয়েছে। এই আলোচনায় কঠোর স্বভাবের বাবা-মায়ের ওপর হতাশ হওয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনায় ভালো করার চাপ বা বাবা-মায়ের উপদেশ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়া তরুণদের কথাও উঠে আসছে।
এই হতাশা এতটাই গভীর যে এটি অনলাইনে 'গোর্ড স্যুপ লিটারেচার' নামে ভাইরাল মিমের জন্ম দিয়েছে। এর নাম এসেছে এক মিনিটের একটি স্কিট বা ছোট ভিডিও থেকে। সেখানে দেখা যায়, একজন ছেলে খুব বিনীতভাবে তার মায়ের দেওয়া এক বাটি লাউয়ের স্যুপ খেতে অস্বীকৃতি জানায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বদমেজাজি হওয়ার জন্য ছেলেটিকেই দোষ দেওয়া হয়।
অনেক তরুণের কাছেই এই স্কিটটি তাদের নিজের জীবনের চেনা চিত্র। বাবা-মায়েরা 'সন্তানের ভালোর জন্যই' কিছু করার কথা বলে মূলত সন্তানের ইচ্ছাগুলোকেই উপেক্ষা করেন।
২৮ বছর বয়সী ঝাও জুয়ান বিবিসিকে বলেন, তার বাবা-মা তাকে এত বেশি 'গোর্ড স্যুপ লিটারেচার' শোনাতেন যে বিরক্ত হয়ে তিনি তার পরিবারের গ্রুপ চ্যাট মিউট করে রেখেছেন।
আগে তিনি তার বন্ধুদের কাছে দুঃখ করতেন এবং তার বাবা-মায়ের আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টা করতেন। এখন তিনি মিম দেখেন, কারণ এই হাস্যরস তাকে মানসিকভাবে সাহায্য করে।
ঝাও বলেন, 'আমি একজন থেরাপিস্টের কাছেও গিয়েছিলাম, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারি যে কান্নাকাটি করে সমস্যার সমাধান হবে না। আমার মা তো বদলাবেন না, তাই আমি শুধু নিজের মানসিকতাই বদলাতে পারি। আর সেটি হলো, তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা যেন এটা একটা রসিকতা।'
ভিনসেন্টের কাছে তার 'ভার্চ্যুয়াল বাবা-মা' তাকে তার জীবনের সেই সহজ ও সুন্দর সময়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্যান এবং ঝাংয়ের সুপারমার্কেটে যাওয়ার সাম্প্রতিক একটি ভিডিওর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'আমি ছোটবেলার সেই দিনগুলো খুব মিস করি, যখন স্প্রিং ফেস্টিভ্যালের আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাজার করতে যেতাম। অনেক, অনেক দিন ধরে আমাদের মধ্যে কোনো চাপমুক্ত সাধারণ কথাবার্তা হয় না।'
ভিনসেন্ট বোঝেন যে এই কনটেন্টগুলো যেহেতু খুব জনপ্রিয় হয়েছে, তাই এর পেছনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমি জানি এই ভ্লগাররা হয়তো এখন বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর ভিডিও বানাচ্ছেন এবং হয়তো কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও করেছেন।'
তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে ভার্চ্যুয়াল সন্তানদের সান্ত্বনা দেওয়া বা উপদেশ দেওয়া বাস্তবে সন্তান পালনের চেয়ে অনেক সহজ। তার পরও তিনি এই ট্রেন্ডের মধ্যে কিছুটা শান্তি খুঁজে পান।
তিনি বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি, একেবারে কিছু না থাকার চেয়ে অন্তত একটুখানি উষ্ণতা পাওয়াও অনেক ভালো।'
