মার্কিন সরকারের চাপে ক্লডের ‘অতিরিক্ত শক্তিশালী’ এআই মডেল বন্ধ করল অ্যানথ্রোপিক
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ জানানোর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় নিজেদের শক্তিশালী নতুন এআই মডেল স্থগিত করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক।
নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, ক্লড ফেবল ৫ প্রোগ্রামটি বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এই মডেলটিকে 'অত্যন্ত শক্তিশালী' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'নির্দেশনা মেনে চলতে আমাদের সব গ্রাহকের জন্য ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫ হঠাৎ করেই বন্ধ করতে হচ্ছে।'
উল্লেখ্য, অ্যানথ্রোপিক এবং ট্রাম্প প্রশাসন একটি পৃথক চলমান মামলাতেও জড়িত। সেখানে কোম্পানিটির এআই টুল সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যবহার বন্ধ করার একটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে বিবিসি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের কাছে মন্তব্য জানতে চেয়েছে।
ক্লড ফেবল ৫ হলো অ্যানথ্রোপিকের 'ক্লড মিথোস' এর একটি উন্নত সংস্করণ, যা ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি এবং গুগলের জেমিনাই-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রোগ্রামের সমকক্ষ।
অ্যানথ্রোপিক বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট উদ্বেগের কথা জানায়নি।
কোম্পানিটি জানায়, 'আমাদের ধারণা, সরকার ফেবল ৫-কে পাশ কাটানো বা 'জেলব্রেক' করার একটি পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছে।'
জেলব্রেকিং হলো একটি সাইবার নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত রাখার জন্য ডিজাইন করা সফটওয়্যার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার একটি প্রক্রিয়া, যা হ্যাকারদের সংবেদনশীল তথ্য অ্যাক্সেস করতে বা বিভিন্ন ফিচার আনলক করার সুযোগ দেয়।
কোম্পানিটি বলেছে, তারা ওই কৌশল পর্যালোচনা করেছে এবং এতে কেবল আগে থেকেই পরিচিত কিছু ছোটখাটো দুর্বলতা শনাক্ত করা গেছে। তাদের দাবি, এসব দুর্বলতা তুলনামূলক সহজ এবং অন্য অনেক উন্মুক্ত এআই মডেলও কোনো নিরাপত্তা ভাঙন ছাড়াই সেগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম।
ফেবল ৫ উন্মুক্ত করার আগে সাইবার হামলা ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার কথা জানিয়েছিল অ্যানথ্রপিক।
এর আগে এপ্রিল মাসে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে মডেলটি কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় কোম্পানি বলেছিল, কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ বা হ্যাক করার সক্ষমতা থাকায় এ প্রযুক্তি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আগে অ্যানথ্রপিক দাবি করেছিল, ফেবল ৫ 'এতটাই শক্তিশালী' যে সবার জন্য উন্মুক্ত করা যায় না'। তবে সমালোচকদের একটি অংশ এ দাবিকে অতিরঞ্জিত প্রচারণা ও বিপণন কৌশল বলে অভিহিত করেছিল।
কোম্পানিটির ভাষ্য, 'ফেবলের সক্ষমতা আমাদের আগের যেকোনো মডেলের চেয়ে বেশি।'
তবে লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির 'রেসপনসিবল এআই' অধ্যাপক জিনা নেফ বলেন, মডেলটির ব্যবহার সীমিত করা হলে এ ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নিরাপদ পরীক্ষার সুযোগ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে সহযোগিতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমরা এখন একেবারেই নতুন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এআই খাতের ভেতর থেকেই দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করা হচ্ছে যে প্রযুক্তিগুলো দ্রুত উন্নত হচ্ছে এবং সাইবার হামলা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।'
নেফের দাবি, যুক্তরাজ্য সরকারের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় দেখা গেছে, মডেলটি ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।
তার ভাষায়, 'সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি সক্ষমতার এক বড় পরিবর্তন।'
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনার মুখেও পড়েছে অ্যানথ্রপিক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে কোম্পানিটির সমালোচনা করেছেন। পরে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অ্যানথ্রপিককে 'সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি' হিসেবে আখ্যা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানিকে এ ধরনের তকমা দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী বা বৈরী দেশের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বা সেবা সরকারি ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ নয় বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ঘোষণার বিরুদ্ধে পেন্টাগনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে অ্যানথ্রপিক। তবে এক মার্কিন বিচারক রায় দিয়েছেন, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পেন্টাগনের নির্দেশনা কার্যকর করা যাবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবে।
