ইরানের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি তেহরানের
ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা জবাব দিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম।
ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই জবাব তেহরানে পৌঁছেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, জবাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে তেহরান।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই জবাব পাঠানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ইসরায়েলের কান নিউজকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি তার কাছে অগ্রহণযোগ্য।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তেহরানের প্রস্তাবিত ১৪ দফা শান্তি পরিকল্পনার কয়েকটি প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে—ইরান সীমান্ত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করা।
এছাড়া, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে দুই দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের নতুন প্রস্তাবে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ না বাড়িয়ে 'যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার' দিকে মনোযোগ দিতে দুই পক্ষকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, 'এই পর্যায়ে আমাদের পারমাণবিক আলোচনা নেই'—যা ওয়াশিংটনের একটি প্রধান দাবি।
ইরান বারবার পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের এই কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য। তবে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা দেশগুলোর মধ্যে ইরানই একমাত্র দেশ যারা অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে।
এদিকে রোববার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, 'ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে জানিয়েছি, তাদের জাহাজগুলোকে এই অবরুদ্ধ জলপথ থেকে নিরাপদে বের করে আনতে আমরা পথ দেখাব, যাতে তারা আবারও অবাধে বাণিজ্য শুরু করতে পারেন।'
ট্রাম্প আরও জানান, এই উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম', যা সোমবার থেকে কার্যকর হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হলে তা বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিহত করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল সীমিত করে দেয় ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।
শনিবার ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি হাতে পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে তিনি বলেন, 'ইরান যে পরিকল্পনাটি আমাদের কাছে পাঠিয়েছে, তা আমি শিগগিরই পর্যালোচনা করব। তবে এটি গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না, কারণ গত ৪৭ বছরে মানবতা ও বিশ্বের প্রতি তারা যা করেছে, তার জন্য এখনো যথেষ্ট মূল্য পরিশোধ করেনি।'
একই দিন ফ্লোরিডার পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, তাকে ইতোমধ্যে 'চুক্তির ধারণা' সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'এখন তারা আমাকে সঠিক ভাষ্যটি দেবে।'
ইরানের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য সামরিক হামলা পুনরায় শুরু হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটি 'একটি সম্ভাবনা'। তিনি বলেন, 'যদি তারা খারাপ আচরণ করে, যদি তারা কিছু খারাপ করে।' তবে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত না দিয়ে তিনি যোগ করেন, 'এই মুহূর্তে দেখা যাক।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই সংঘাত থেকে পুরোপুরি সরে আসার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, 'আমরা চলে যাচ্ছি না। আমরা কাজটি এমনভাবে শেষ করতে চাই যাতে আগামী দুই বা পাঁচ বছরের মধ্যে কাউকে আর এখানে ফিরে আসতে না হয়।'
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তেহরানের এই সর্বশেষ প্রস্তাবটি ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৯ দফার একটি পরিকল্পনার জবাব। সেখানে দুই মাসের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের নতুন করে অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। গত শুক্রবার কংগ্রেস সদস্যদের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি যুক্তি দেন, ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় সংঘাতটি 'শেষ' হয়ে গেছে। তাই এ সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতার সময়সীমাও বর্তমানে স্থগিত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ট্রাম্প তার চিঠিতে আরও দাবি করেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর বর্তমানে যে নৌ-অবরোধ চলছে, সেটি এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতা বা সংঘাতের কোনো অংশ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযানের বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের অবহিত করার ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়, অন্যথায় সেই অভিযান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর গত ২ মার্চ ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে তা জানিয়েছিলেন। সেই হিসেবে গত শুক্রবার ছিল অভিযানের ৬০তম দিন।
এদিকে, এই সংঘাত নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এমনকি ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যও এই ব্যয়বহুল ও অস্পষ্ট লক্ষ্যের যুদ্ধ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছেন।
মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর জোশ হাওলি প্রশাসনকে সংঘাত থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। হাওলি বলেন, 'আমি আসলে এটি (যুদ্ধ) চাই না। আমি এখন এটি গুটিয়ে আনতে চাই।'
আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মুরকোস্কিও এই অভিযানের সাফল্য এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রশাসন আলোচনার কথা বললেও রণক্ষেত্রের বাস্তবতা এবং তেহরানের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।'
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি হুট করে এবং সময়ের আগে পিছু হটে, তবে ইরানের প্রধান সামরিক সক্ষমতাগুলো অক্ষুণ্ন থেকে যাবে। আমি সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নই। তবে এর সমাধান আবার কোনো অন্তহীন যুদ্ধের জন্য নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়াও নয়।'
