সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে ভেনিসে যেতে হবে সাবমেরিনে চেপে: গবেষণা
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি এভাবে বাড়তেই থাকে, তবে ইতালির বিখ্যাত শহর ভেনিসের স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখতে পর্যটকদের হয়তো সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ ব্যবহার করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।
আঁকাবাঁকা খাল আর অসংখ্য দ্বীপের শহর হিসেবে ভেনিসের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পর্যটকের ভারে শহরটি এখন পানিতে তলিয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর রাস্তাগুলো যেমন পর্যটকে ঠাসা থাকে, তেমনি বন্যার পানিতেও ডুবে থাকতে দেখা যায়।
গত ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সাগেন্টো ইউনিভার্সিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে হারে বাড়ছে, তা সামলাতে শহরটিকে দীর্ঘমেয়াদে 'নজিরবিহীন' কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
এর মধ্যে শহরের ঐতিহ্য রক্ষা, সামাজিক কল্যাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, ভেনিসকে লেগুন বা উপহ্রদ থেকে আলাদা রাখতে বড় ধরনের বন্যা প্রতিরোধক বাধা (ফ্লাড ব্যারিয়ার) তৈরি করার কথা বিবেচনা করা উচিত।
অথবা লেগুনের চারপাশে স্থায়ী উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করা যেতে পারে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি, অর্থাৎ যদি পুরো শহরটি পানিতে তলিয়ে যায়, তবে ঐতিহাসিক আকর্ষণগুলো খুলে আরও ভেতরের দিকে নিয়ে গিয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে।
যদিও এই বিপদ এখনই ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে না, তবে বর্তমান জলবায়ু নীতি এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যাওয়ার পূর্বাভাসের কারণে ২২শ শতকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এড়ানো কঠিন হতে পারে।
ভেনিসে বাইজেন্টাইন ঘরানার সেন্ট মার্কস ব্যাসিলিকা এবং গথিক ডগস প্যালেসের মতো অনেক ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, স্থানান্তরের মাধ্যমে হয়তো কিছু স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষা করা সম্ভব হবে, তবে 'ঐতিহাসিক শহরের গঠন, লেগুন-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা এবং বেশিরভাগ অর্থনৈতিক কার্যক্রম চিরতরে হারিয়ে যাবে।'
গবেষকরা ধারণা করছেন, এ ধরনের প্রকল্পের পেছনে খরচ হতে পারে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ইউরো (প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড)।
স্মৃতিস্তম্ভ ছাড়াও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িও ফেলে যেতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি হারানোর এই ক্ষতির পরিমাণ ৬.৫ বিলিয়ন ইউরো (৫.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) পর্যন্ত হতে পারে।
বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া এসব অবশিষ্টাংশ যদি কেউ দেখতে চান, তবে তাদের নৌকা এবং সাবমেরিনের মাধ্যমে সীমিত সময়ের জন্যই সেখানে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সাগেন্টো ইউনিভার্সিটির এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া পিয়েরো লিওনেলো দ্য টাইমস-কে বলেন, 'এই পরিস্থিতি বিলম্বিত করার জন্য আমাদের হাতে কিছু উপায় আছে ঠিকই, তবে সেগুলো চিরকাল কাজ করবে না ভবিষ্যতের এই পরিণতি যেন অবশ্যম্ভাবী।'
২০২০ সালে ভেনিস শহরকে উঁচু জোয়ার এবং ভয়াবহ বন্যা থেকে রক্ষায় লেগুনের বিভিন্ন প্রবেশপথে 'মোসে' নামের একটি বন্যা প্রতিরোধক ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল।
শহরটির অর্ধেকেরও বেশি অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতার চেয়ে মাত্র ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
এর ফলেই শহরটি বন্যার এত বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। লিওনেলো জানান, ২১০০ সালের মধ্যে ভেনিসে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ৪২ থেকে ৮১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে মোসে এবং অন্যান্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা ভেনিসকে সাহায্য করতে পারলেও, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতে এখন থেকেই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
